বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন

রাণীশংকৈলে স্মৃতির ভার বয়ে বীরাঙ্গনা টেপরী রানীর বিদায়

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি ॥
মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় স্মৃতি, দীর্ঘ সামাজিক অবহেলা আর অগণিত অপমান বুকে নিয়ে জীবন কাটানো বীরাঙ্গনা টেপরী রানী আর নেই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই বীর নারী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
বুধবার সকালে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিক। টেপরী রানীর বয়স তখন মাত্র ১৬ বা ১৭। চারদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা। পরিবারের সদস্যদের প্রাণ রক্ষার আশায় এক অসহায় বাবা শেষ পর্যন্ত মেয়েকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে দিতে বাধ্য হন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেই যাত্রাপথে বাবা-মেয়ের মধ্যে কোনো কথা হয়নি- চারপাশ শুধু ভারী হয়ে উঠেছিল নীরব কান্নায়।

পরবর্তী সাত মাস পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন টেপরী রানী। নিজের সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে তিনি রক্ষা করেছিলেন পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন। স্বাধীনতার পর তিনি বাড়ি ফেরেন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়।

যুদ্ধশেষে সমাজ তাঁর অনাগত সন্তানকে সহজভাবে মেনে নেয়নি। গর্ভপাতের জন্যও নানা চাপ এসেছিল। কিন্তু তাঁর বাবা মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, এই সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন। পরে জন্ম হয় সুধীর বর্মনের।

স্বাধীন দেশে ফিরেও থামেনি অপমান। ছোটবেলা থেকেই সমাজের একাংশ সুধীর বর্মনকে কটাক্ষ করে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে ডাকত। আজ সেই সুধীর বর্মন জীবিকার তাগিদে ভ্যান চালান। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের এক নির্মম ইতিহাস।

তাঁর ব্যবহৃত পুরোনো বাটন ফোনে এখনো বেজে ওঠে- এক সাগর রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ অবহেলার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান টেপরী রানী। পরের বছর তাঁর আত্মত্যাগের গল্প প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, জীবনের শেষ সময়ে এই স্বীকৃতি তাঁকে কিছুটা হলেও মানসিক শান্তি দিয়েছিল।

টেপরী রানীর নাতনি জনতা বলেন, দাদীকে নিয়ে এখন আমাদের গর্ব হয়। দেশের জন্য তিনি যে ত্যাগ করেছেন, তা কোনো দিন ভোলার নয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, টেপরী রানী শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। তাঁর জীবন আমাদের স্বাধীনতার মূল্য ও ত্যাগের গভীরতা স্মরণ করিয়ে দেয়।

জীবদ্দশায় টেপরী রানীর ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে লাল-সবুজের পতাকায় মোড়ানো হয়। বুধবার রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে পূরণ হয়েছে সেই শেষ ইচ্ছা।
অভিমান, বেদনা আর আত্মত্যাগে ভরা এক দীর্ঘ জীবন শেষে বিদায় নিলেন টেপরী রানী। তবে তাঁর গল্প থেকে যাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে-এক নীরব অথচ অমলিন সাক্ষ্য হয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com