বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক ও অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা ॥
তহবিল সংকটে জর্জরিত সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। তবে এই বিশাল ব্যয়ের সংস্থান করতে গিয়ে সরকারকে রেকর্ড পরিমাণ দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একদিকে রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি, অন্যদিকে পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের প্রচণ্ড চাপ- সব মিলিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ঋণের লক্ষ্যমাত্রায় নতুন রেকর্ড
অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইআরডি সূত্রমতে, প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও বাকি অর্থের বড় অংশই আসবে ঋণ থেকে। এর মধ্যে:
বৈদেশিক ঋণ: ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (ইতিহাসের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা)।
অভ্যন্তরীণ ঋণ: ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট সহায়তা ঋণ: প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক ঋণও ছাড় করতে পারেনি সরকার।
ঋণ পরিশোধের ‘মরণকামড়’
নতুন ঋণ নেওয়ার সমান্তরালে বাড়ছে পুরনো ঋণ পরিশোধের বোঝা। ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে হবে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হওয়ায় আগামী বছরগুলো হবে চরম চাপের। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে এই চাপ দাঁড়াবে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে।
রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যাংক ঋণের নেতিবাচক প্রভাব
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চিত্রও সুখকর নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা তৈরি করে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।
আইএমএফ-এর শর্ত ও ভর্তুকির চাপ
আইএমএফ-এর ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের পরবর্তী কিস্তি নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি। সংস্কার ও শর্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বৈঠক থেকে কোনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। এদিকে ভর্তুকির চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, “বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই ঋণ ফাঁদে না পড়ে। এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নিজস্ব সম্পদ আহরণ ও রাজস্ব বাড়ানো।”
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, শুধু ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপের প্রকৃত মূল্যায়ন ও সমন্বিত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
উপসংহার
বিলাসী এই বাজেট বাস্তবায়নে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয় মেটানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যথাযথ কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ঋণের ওপর নির্ভরশীল এই বিশাল বাজেট ভবিষ্যতে দেশকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।