মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ন

মাদকের বিরুদ্ধে ফতুয়ায় সামাজিক প্রতিরোধ সচেতন মানুষের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ

মাদকের বিরুদ্ধে ফতুয়ায় সামাজিক প্রতিরোধ সচেতন মানুষের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ

মাঈন উদ্দিন, খালিয়াজুরী থেকে:  মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে তরুণ ও নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়নের ফতুয়া গ্রামে মাদকবিরোধী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে ফতুয়া গ্রামের ঈদগাহ মাঠে গ্রামের সচেতন মহলের উদ্যোগে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, তরুণ-যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সভায় বক্তারা বলেন, মাদকের কারণে পরিবার ও সমাজে অপরাধ, অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ায় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদক প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চাকুয়া ইউনিয়নের লেপসিয়া, হাতিলা, বল্লী, ফতুয়া ও রানীচাপুরসহ কয়েকটি গ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের ব্যবহার বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফতুয়া গ্রামকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এ সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, তরুণদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং মাদকসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

ফতুয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “গ্রামে কয়েকজন মাদকের ডিলার রয়েছে বলে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হয়। বিষয়টি নিয়ে একজন গ্রামবাসী হিসেবে নিজেকে অসহায় মনে হয়। তাই গ্রামের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কেউ মাদক ব্যবসা বা সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। মাদক ব্যবসা বা সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সম্মিলিতভাবে পুলিশকে জানানো হবে।”

গ্রামের তরুণ মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, “মাদক প্রতিরোধে গ্রামের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের গ্রামে কেউ মাদক বিক্রি বা সেবন করলে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হবে। একই সঙ্গে বাইরে থেকে যাতে গ্রামে মাদক প্রবেশ করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা হবে। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতেই আমাদের এই উদ্যোগ।”

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মুখলেছ মিয়া বলেন, “চাকুয়া ইউনিয়নের লেপসিয়া, হারারকান্দি, রানীচাপুর ও ফতুয়া গ্রামে মাদকের বিস্তার নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে ফতুয়া গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে মাদক প্রতিরোধে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাদক বিক্রি ও সেবন দুটিকেই আমরা অপরাধ হিসেবে দেখছি।”

তিনি জানান, মাদক প্রতিরোধে ফতুয়া গ্রামের তিনটি মহল্লায় ১০ সদস্য করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা নিজ নিজ এলাকায় তদারকি করবে। কারও বিরুদ্ধে মাদক বিক্রি বা সেবনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি তিন মহল্লার সমন্বয়ে গঠিত আরও একটি ১০ সদস্যের কমিটিকে জানানো হবে। পরে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে অবহিত করা হবে।

তিনি আরও জানান, গত ২৪ আগস্ট ফতুয়া গ্রামের মতি মিয়া ও কাজলকে মাদক সেবনের অভিযোগে পুলিশে দেওয়া হয়েছে।

খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসিরুদ্দিন বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে ফতুয়া গ্রামবাসীর এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। হাওরাঞ্চলের অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শুধু পুলিশের একার পক্ষে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি আরও বলেন, “খালিয়াজুরী থানার আওতাধীন প্রতিটি এলাকায় মাদক বিস্তার রোধে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি বা সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রামবাসী কোনো তথ্য পেলে নিজেরা আইন হাতে না তুলে পুলিশকে জানালে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।”

খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জান বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান জিরো টলারেন্স। মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”

তিনি বলেন, মাদকের বিস্তার রোধ করা না গেলে এর সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি ও অন্যান্য অপরাধও বাড়তে পারে। তাই ফতুয়া গ্রামবাসীর সামাজিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, মাদক প্রতিরোধে গ্রামের মানুষের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। তবে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কাউকে হয়রানি বা আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইউএনও বলেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকের কুফল নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুত্ব ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে দায়িত্বশীল নজরদারি বাড়াতে হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিবার, সমাজ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত উদ্যোগে ফতুয়া গ্রামসহ পুরো চাকুয়া ইউনিয়নকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com