মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন
মাঈন উদ্দিন, খালিয়াজুরী থেকে : মাদকের ভয়ানক ছোবল থেকে তরুণ ও নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা সামাজিক ভাবে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়নের লেপসিয়া গ্রামে মাদকবিরোধী এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাত আনুমানিক ৯টায় লেপসিয়া একতা সংঘ ক্লাবের মাঠে গ্রামের সচেতন মহলের উদ্যোগে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, তরুণ-যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
সভায় বক্তারা বলেন, মাদকের কারণে পরিবার ও সমাজে অপরাধ, অস্থিরতা এবং সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের একটি অংশ মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ায় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদক প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চাকুয়া ইউনিয়নের লেপসিয়া, ফরিদপুর, হাতিলা, বল্লী, ফতুয়া ও রানীচাপুরসহ কয়েকটি গ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের ব্যবহার বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে লেপসিয়া গ্রামকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, তরুণদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং মাদকসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। লেপসিয়া পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা আলকাছ মিয়া বলেন, “গ্রামে কয়েকজন মাদকের ডিলার রয়েছে বলে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হয়। বিষয়টি নিয়ে একজন গ্রামবাসী হিসেবে নিজেকে অসহায় মনে হয়। তাই গ্রামের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কেউ মাদক ব্যবসা বা সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। মাদক ব্যবসা বা সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সম্মিলিত ভাবে পুলিশকে জানানো হবে।”
লেপসিয়া গ্রামের যুবক মো. আলমগীর হোসেন আলম বলেন, “মাদক প্রতিরোধে গ্রামের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের গ্রামে কেউ মাদক বিক্রি বা সেবন করলে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হবে। একই সঙ্গে বাইরে থেকে যাতে গ্রামে মাদক প্রবেশ করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা হবে। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতেই আমাদের এই উদ্যোগ।”
গ্রামের সমাজসেবক মাঈন উদ্দিন মুন্না খান বলেন, “চাকুয়া ইউনিয়নের ফতুয়া, রানীচাপুর, হারারকান্দি ও লেপসিয়া গ্রামে মাদকের বিস্তার নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে লেপসিয়া গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে মাদক প্রতিরোধে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাদক বিক্রি ও সেবন দুটিকেই আমরা গুরুতর সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখছি।”
তিনি জানান, মাদক প্রতিরোধে লেপসিয়া গ্রামের তিনটি মহল্লায় ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় তদারকি করবেন। কারও বিরুদ্ধে মাদক বিক্রি বা সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে মহল্লার সমন্বয়ে তা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হবে। পরে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে অবহিত করা হবে।
লেপসিয়া পশ্চিম পাড়ার তরুণ জামাল মিয়া বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরা সমাজের কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তাই প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজনকে সচেতন থাকতে হবে। নিজের সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কখন বাড়ি ফিরছেসেদিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। সন্তান যাতে কোনো ভাবেই বিপথে না যায়, সেজন্য তাদের প্রতি নিয়মিত নজর রাখতে হবে।”
লেপসিয়া চেয়ারম্যান পাড়ার তরুণ মনির হোসেন বলেন, “মোবাইল জুয়া, গাঁজা ও ইয়াবার মতো মাদক ও ক্ষতিকর আসক্তি প্রতিরোধ করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে পুরো সমাজকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।”
লেপসিয়া দক্ষিণ পাড়ার যুবক রুকন মিয়া বলেন, “সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে মাদক দমন করা সম্ভব হবে। এতে আমাদের পরিবার ও সমাজ উভয়ই নিরাপদ থাকবে এবং তরুণ প্রজন্ম একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ পাবে।”
খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসিরুদ্দিন বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে লেপসিয়া গ্রামবাসীর এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। হাওরাঞ্চলের অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শুধু পুলিশের একার পক্ষে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও বলেন, “খালিয়াজুরী থানার আওতাধীন কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি বা সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রামবাসী কোনো তথ্য পেলে নিজেরা আইন হাতে না তুলে পুলিশকে জানালে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।” খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জান বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান জিরো টলারেন্স। মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
তিনি বলেন, “মাদকের বিস্তার রোধ করা না গেলে এর সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি ও অন্যান্য অপরাধও বাড়তে পারে। তাই লেপসিয়া গ্রামবাসীর সামাজিক উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। মাদক প্রতিরোধে গ্রামের মানুষের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়।” তবে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কাউকে হয়রানি কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইউএনও বলেন, কারও বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।