শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

নেপালে ৯ দিন পর অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেন দুই শ্রমিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: কাদা, পানি আর বিশাল পাথরের চাপে মুহূর্তে ধসে পড়ে পুরো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। চারপাশের চিৎকার আর হাহাকার নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে যায় শত শত টন পলির নিচে। ঠিক তখনই ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে আটকে পড়েন দুই তরুণ। বাইরের দুনিয়ার কাছে তখন তারা কেবলই নিখোঁজ তালিকার দুটি সংখ্যা।

তবে প্রকৃতি যতটাই নির্মম ছিল, এই দুই তরুণের জীবনের আকুতি ছিল তার চেয়েও প্রখর। নেপালের রসুয়ায় ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ১৭০ মিটার (৫৫৮ ফুট) গভীরে ৯ দিন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অবশেষে আলোয় ফিরেছেন মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ (৩০) এবং মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহারজন। কাদার স্তূপ ঠেলে তাদের বাইরে আসার এ ঘটনাকে স্বজনরা কেবল একটি শব্দেই ব্যাখ্যা করছেন অলৌকিক।

২৬ আগস্ট সকাল। হিমালয়ের কোলঘেঁষে বয়ে চলা ভোটেকোশি ও ত্রিশূলি নদীর অববাহিকায় তখন তাণ্ডব চালাচ্ছিল তিব্বত সীমান্ত থেকে নেমে আসা হিমবাহ ধসের পানি। প্রকল্পের কন্ট্রোল রুমে ডিউটিতে ছিলেন সপ্তরী জেলার তরুণ সঞ্জয় শাহ। পানি ঢুকতে শুরু করতেই সুড়ঙ্গের ভেতরে শুরু হয় জীবন বাঁচানোর হুড়োহুড়ি।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সঞ্জয় বলেন, ফোরম্যান হিসেবে নিজের জীবনের চেয়ে সহকর্মীদের নিরাপত্তাই ছিল তার কাছে মুখ্য। সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে ঠেলে দিতে গিয়ে নিজের বের হওয়ার পথটাই বন্ধ হয়ে যায়। সুড়ঙ্গের আঁধারে নিজেকে শান্ত রাখতে সঞ্জয় বিরামহীন মন্ত্র আর জপ করে গেছেন। ঘুটঘুটে অন্ধকারে যখন আশা প্রায় শেষ, তখনো পাশ থেকে ভেসে আসছিল কয়েকজনের ক্ষীণ আর্তচিৎকার। সঞ্জয় বলেন, আমরা একে অপরকে চিৎকার করে ডেকে ওঠার সাহস জোগাচ্ছিলাম।

উদ্ধারের পর সেনা কর্মকর্তাদের কাঁধে চড়ে যখন তিনি প্রথম আলো দেখলেন, কাদামাখা সজ্ঞান সঞ্জয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রথম প্রশ্নটিই ছিল নিঃশব্দ এক হাহাকার, আজ কী বার?

কুলেখানি প্রকল্প থেকে রুটিন মেরামতের কাজে ত্রিশূলী ৩এ প্রজেক্টে গিয়েছিলেন কীর্তিপুরের বাসিন্দা কবির মহারজন। কাজ শুরু করার আগে স্ত্রী হীরা শোভাকে ফোনে বলেছিলেন, আমরা নিচে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাচ্ছি, সেখানে নেটওয়ার্ক থাকবে না।

সেই যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো, তারপর দীর্ঘ ৯ দিন শুধু অপেক্ষা আর চোখের জল। কাঠমান্ডুর আর্মি হাসপাতালের আইসিইউতে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন হীরা শোভা। তিনি বলেন, এই কান্না কষ্টের নয়, স্বস্তির। আমরা খাওয়া-ঘুম সব ভুলে গিয়েছিলাম; কিন্তু হৃদয়ের কোণে বিশ্বাস ছিল, সে ফিরে আসবে। আজ মনে হচ্ছে, আমার স্বামী দ্বিতীয় জীবন পেয়েছেন। আমি আনন্দের অশ্রু ধরে রাখতে পারছি না।

ঘটনার পর থেকে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো বিশাল পাথর আর কাদাতে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রসুয়াগধি ও ত্রিশূলি ৩এ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ সেই অন্ধকার পকেটে পৌঁছাতে উদ্ধারকারীদের লেগে যায় প্রায় ছয় দিন।

সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (এপিএফ) একটি যৌথ অনুসন্ধানকারী দল জীবন ঝুঁকি নিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিটার পলি ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে প্রধান অংশে পৌঁছায়। এপিএফের উদ্ধারকারী সদস্য অম্বর মহাত জানান, পাওয়ার হাউসের পাশের একটি অক্ষত ভবনের অংশ থেকে অলৌকিকভাবে তাদের জীবিত পাওয়া যায়। তবে জীবনের এই জয়ের গল্পের পাশেই ছিল মৃত্যুর এক স্তব্ধতা—সেই একই জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও একজনের নিথর মরদেহ।

উদ্ধার করা দুজনকে তাৎক্ষণিকভাবে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সঞ্জয় শাহ আপাতত শঙ্কামুক্ত হলেও কবির মহারজনের শারীরিক অবস্থা কিছুটা আশঙ্কাজনক।

এদিকে, সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়ে আর কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় গতকাল শুক্রবার বিকেলে আপাতত উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। এই হড়পা বানে এখন পর্যন্ত ১ গাজার ২৮৭ জন নিহতের খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া ৫ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ।

প্রকৃতির ভয়াল থাবায় নেপালের নদী অববাহিকা যখন শোকের মাতমে ভারী, ঠিক তখনই সঞ্জয় আর কবিরের এই ফিরে আসা এক প্রদীপশিখা হয়ে জ্বলছে—যাতনার আঁধারে জীবন কীভাবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে জয়ী হতে পারে, তার এক জীবন্ত উপাখ্যান হয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com