বৃহস্পতিবার, ০৪ Jun ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ন
আদালত প্রতিবেদক, ঢাকা, ক্রাইম ডেস্ক ॥
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলার রায় আগামী ৭ জুন (রবিবার) ঘোষণা করা হবে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে রায়ের এই দিন ধার্য করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের সর্বোচ্চ শাস্তি ও আসামিপক্ষের খালাস দাবি
এদিন আদালতে যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং আইনের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও রেফারেন্স বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতকে জানান, সাক্ষীরা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তিনি আসামিদের আইনে বর্ণিত সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ প্রার্থনা করেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ তাঁর যুক্তিতে বলেন, এই মামলায় কোনো ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়নি, আসামিকে ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং আশপাশের কোনো সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে তিনি আসামিদের খালাস ও ন্যায়বিচার চান। চাঞ্চল্যকর এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনতে সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে বিপুল সংখ্যক আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
আদালতে নাটুকে পরিস্থিতি: কাঠগড়ায় দোষ স্বীকার
এর আগে গত বুধবার মামলার আত্মপক্ষ সমর্থন ও সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্কের দিন ধার্য করেছিলেন। শুনানির জন্য সকালে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আদালতে আনা হয়। বেলা ১১টা ২১ মিনিটে সোহেলকে এবং ১১টা ৪০ মিনিটে স্বপ্নাকে এজলাসে তোলা হয়। পৌনে ১২টায় বিচারক আসনে বসলে যুক্তিতর্ক শুরু হয়।
গত ২ জুন মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষীরা শিশু রামিসাকে খোঁজাখুঁজি, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট শনাক্তকরণ, রক্তের আলামত ও মরদেহ উদ্ধারের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ভিডিও প্রমাণ আসামিদের সামনে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠে, অপরাধের পর স্বপ্না আক্তার কীভাবে তাঁর স্বামী সোহেল রানাকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন।
আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় বিচারক আসামি সোহেলের কাছে কিছু বলার আছে কি না জানতে চাইলে সে দোষ স্বীকার করে এক নাটুকে পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সোহেল বলে,
“আমিও দোষ করছি, ডলারও দোষ করছে স্যার। আমাকেও সাজা দেন, সঙ্গে ওকেও দেন। ওরে কেউ দেখে নাই, ওরে ধরেন স্যার।”
নিজের সন্তানের দোহাই দিয়ে ক্ষমা চেয়ে সে আরও বলে,
“আমার ছওয়াল (ছেলে) আছে একটা। আমি ক্ষমা চাচ্ছি স্যার, আমাকে মাফ করে দেন। আরেকটা কথা, আমার বউ কোনো দোষ করেনি, সে নির্দোষ।”
এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে নিজের বক্তব্য দিতে বলেন।
এরপর আদালত স্বপ্নার বক্তব্য জানতে চাইলে সে প্রথমে নিশ্চুপ থাকে। বিচারক তাকে প্রশ্ন করেন, ঘটনার সময় ঘরের দরজা কেন খোলেননি- এর কোনো ব্যাখ্যা আছে কি না? আদালত তাকে সতর্ক করে বলেন, স্বামীর বিরুদ্ধে অপরাধে সহায়তার অভিযোগ প্রমাণিত হলে একই শাস্তি তারও হতে পারে। তখন স্বপ্না কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, “আমি কিছু করিনি স্যার, আমি নির্দোষ।” দুই আসামির বক্তব্য রেকর্ড করার পরই বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্কের দিন ঠিক করা হয়েছিল।
১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন
মামলার মোট ১৮ জন চার্জশিটভুক্ত সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লার জবানবন্দির মাধ্যমে এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল।
পর্যায়ক্রমে আদালতে সাক্ষ্য দেন রামিসার মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুফু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, বাড়ির চতুর্থ তলার বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু, দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামা, ফুফা মনিরুজ্জামান শাহীন, কনস্টেবল রোমা আক্তার ও কনস্টেবল শরীফ মিয়া।
এছাড়াও সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইকবাল হোসেন, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. নাসাদ জাবিন, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে নিজেদের জবানবন্দি ও পেশাদারী মতামত তুলে ধরেন। পুরো দেশের নজর এখন আগামী ৭ জুনের রায়ের দিকে।