মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৭ অপরাহ্ন

মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে পাথর আনতে জাপানের ঐতিহাসিক অভিযান শুরু

ছবি : রয়টার্স

অনলাইন ডেস্ক:: মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযান শুরু করেছে জাপান। বিজ্ঞানীদের আশা, এই অভিযানের সংগৃহীত নমুনা সৌরজগতের সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তানেগাশিমা দ্বীপ থেকে স্থানীয় সময় ভোরে এইচ-৩ রকেটের মাধ্যমে ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি আগামী বছরের আগস্টে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছাবে। এরপর মঙ্গলের দুটি ছোট, আলুর মতো আকৃতির উপগ্রহের একটি ফোবোসের পৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১০ গ্রাম মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করবে। ২০৩১ সালে নমুনাসহ মহাকাশযানটির পৃথিবীতে ফেরার কথা রয়েছে।

প্রায় ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার ব্যাসের গর্তযুক্ত ফোবোস মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার ওপরে থেকে গ্রহটিকে দিনে প্রায় তিনবার প্রদক্ষিণ করে।

স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে এইচ-৩ রকেটটি অন্ধকার আকাশে উড়ে যায়। উৎক্ষেপণ সরাসরি সম্প্রচার দেখতে হাজারো মানুষ ভোরে জেগে ছিলেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর মহাকাশযানটি রকেটের ওপরের ধাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে জাক্সার বিজ্ঞানীরা অভিযান শুরুর সাফল্য ঘোষণা করেন। এ সময় নিয়ন্ত্রণকক্ষে উদ্‌যাপনের দৃশ্য দেখা যায়।

গত অর্ধশতকে নাসা মঙ্গলে নয়টি মহাকাশযান অবতরণ করিয়েছে। ২০২১ সালে চীনও মঙ্গলের পৃষ্ঠে মহাকাশযান অবতরণ করায়। তবে ফোবোস কিংবা মঙ্গলের অপেক্ষাকৃত ছোট উপগ্রহ ডেইমোসে অবতরণের চেষ্টা এবারই প্রথম।

জাপানের নেতৃত্বাধীন এই প্রকল্পে যুক্ত নাসার জ্যোতির্পদার্থবিদ টম স্ট্যাটলার বলেন, এখানে প্রচুর উত্তেজনা এবং বিস্ময়ের অনুভূতি রয়েছে।

পাঁচটি মহাকাশ সংস্থা পাঁচ বছর মেয়াদি এই অভিযানে একসঙ্গে কাজ করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফোবোসে একটি রোবোটিক অনুসন্ধানযান ও একটি রোভার পাঠানো হবে।

প্রায় ৫৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ের এই অভিযানে ব্যবহৃত মহাকাশযানটির ওজন পাঁচ টন। আগামী গ্রীষ্মে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছানোর পর এটি ফোবোসের কক্ষপথের সঙ্গে নিজের অবস্থান সমন্বয় করবে। এরপর মহাকাশযান থেকে ছোট ফরাসি-জার্মান রোভার ‘ইডেফিক্স’ বিচ্ছিন্ন করা হবে। নামটি নেওয়া হয়েছে ‘অ্যাস্টেরিক্স’ কমিকসের সাদা টেরিয়ার চরিত্র থেকে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফোবোসের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ হওয়ায় চার চাকার রোভারটি উপগ্রহটির পৃষ্ঠে কয়েক মিনিট লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে গিয়ে একসময় থামবে। এরপর প্রায় ১০০ দিন ধরে পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করবে। মূল নমুনা সংগ্রাহক মহাকাশযান অবতরণের আগে নিরাপদ অবতরণ ও নমুনা সংগ্রহের উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করাই হবে এর কাজ।

মূল মহাকাশযানের চার পা-যুক্ত স্থির অবতরণযানটি ফোবোসে মাত্র দুই ঘণ্টা অবস্থান করবে। এ সময় এটি খননযন্ত্র ও শোষণপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করবে। এরপর আবার মহাকাশে ফিরে যাবে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলের কক্ষপথ ছাড়ার আগে মহাকাশযানটি একাধিকবার ডেইমোসের পাশ দিয়ে উড়ে সেটিকে পর্যবেক্ষণ করবে। ২০৩০ সালের নভেম্বরে মঙ্গলের কক্ষপথ ত্যাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জার্মান মহাকাশ সংস্থার রোভারবিষয়ক প্রধান মার্কুস গ্রেবেনস্টাইন বলেন, এটি জীবনে একবারই আসার মতো সুযোগ। আমরা মঙ্গলব্যবস্থা থেকে প্রথমবারের মতো নমুনা ফিরিয়ে আনার অভিযানের অংশ।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে ফোবোস ও ডেইমোস কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা জানা সম্ভব হবে। এমনকি প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কেও সূত্র মিলতে পারে। নাসার মতে, এমএমএক্স অভিযানের ফলাফল ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযান, এমনকি মানুষবাহী অভিযানের পরিকল্পনাতেও সহায়তা করবে।

উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি প্রধান তত্ত্ব রয়েছে। ‘বৃহৎ সংঘর্ষ’ তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলে আঘাত হানার পর ছিটকে যাওয়া পদার্থ থেকে ফোবোস ও ডেইমোসের সৃষ্টি হয়েছে।

অন্য তত্ত্বটি ‘মহাকর্ষে বন্দি’ হওয়ার ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এতে বলা হয়, উপগ্রহ দুটি আসলে গ্রহাণু, যা মঙ্গলের মহাকর্ষের টানে তার কক্ষপথে আটকা পড়েছে।

জাক্সার মতে, কোন তত্ত্বটি সঠিক, তা নির্ধারণ করা গেলে পৃথিবীসহ সূর্যের কাছের পাথুরে গ্রহগুলোতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। সূর্যের নিকটতম চারটি গ্রহ হলো বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল।

মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে পাথরের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেও প্রতিযোগিতা চলছে।

নাসার ‘পারসিভিয়ারেন্স’ রোভার ২০২১ সাল থেকে মঙ্গলে অনুসন্ধান চালিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে কংগ্রেসের ভোটের পর ট্রাম্প প্রশাসন নমুনাগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা স্থগিত করে।

অন্যদিকে, চীনের ‘তিয়ানওয়েন-৩’ মহাকাশযান ২০২৮ সালের দিকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যেই মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাপানের উপগ্রহ অভিযান পৃথিবীতে ফেরার আগেই চীনের মঙ্গল অভিযান নমুনা নিয়ে ফিরে আসতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com