মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি ॥
কলেজে ছিলেন পেছনের সারির শিক্ষার্থী। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় কোচিংয়ের মডেল টেস্টেও আসত কম নম্বর। একপর্যায়ে নিজের ওপর থেকে আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলেছিলেন মেহেরাব হোসাইন মুনাদ। তবে হতাশ হয়ে হাল ছাড়েননি তিনি। ধারাবাহিক চেষ্টা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে তোলার মাধ্যমে সেই মুনাদই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের (সি ইউনিট) মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।
শুধু চবির সি ইউনিটেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়টির বি ইউনিটে ৬১৭তম ও ডি ইউনিটে ১৪১তম স্থান অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায়ও ৬৭৪তম হয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যয়ন করছেন।
সাফল্যের মুহূর্ত ও পেছনের গল্প
ফল প্রকাশের দিনের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে মুনাদ জানান, সকাল থেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। বেলা ১১টার দিকে যখন ফলাফল দেখতে পান এবং নিজের মেধাক্রম প্রথম দেখতে পান, তখন প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। তাৎক্ষণিকভাবে মা ও পরিবারের অন্যদের জানান সবাই দারুণ খুশি হন। কলেজে পেছনের সারির স্টুডেন্ট হওয়ায় এই সাফল্যে চারপাশের অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন। তার মতে, এই সাফল্য শুধু প্রথম হওয়ার আনন্দ নয়; বরং প্রস্তুতির সময়ের সব দুশ্চিন্তা ও কষ্টের সার্থক রূপায়ন।
প্রস্তুতি ও সময় ব্যবস্থাপনা
এইচএসসির আগে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা না থাকলেও পরবর্তীতে এইচএসসি শেষ করেই গোছানো প্রস্তুতি শুরু করেন মুনাদ। সময় কম থাকায় তিনি একটি বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করেন, যা প্রতিদিন নিয়মিত বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল। কত দিন আগে প্রস্তুতি শুরু হলো তার চেয়ে প্রাপ্ত সময়কে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হলো, সেটাই তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল বলে মনে করেন তিনি।
পড়ার সময় নির্দিষ্ট কোনো ঘণ্টা নির্ধারণ না করে প্রতিদিনের টপিকভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণকেই প্রাধান্য দিতেন। যে বিষয়ে দুর্বলতা বেশি ছিল, সেটির পেছনে তুলনামূলক বেশি সময় ব্যয় করতেন। কঠিন বিষয়গুলো এড়িয়ে না গিয়ে সেগুলোতে বেশি মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাসই তাকে এগিয়ে রেখেছে বলে জানান তিনি।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও মডেল টেস্টের গুরুত্ব
প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করার কথা উল্লেখ করে মুনাদ জানান, প্রতিদিন সমান আগ্রহ না থাকলেও যেদিন ক্লান্তি বা অনীহা কাজ করত, সেদিনও পড়াশোনার সঙ্গে ন্যূনতম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি।
কোচিংয়ের পাশাপাশি মডেল টেস্টের ভুলগুলোকে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা ছিল তাঁর সাফল্যের অন্যতম গোপনীয়তা। ভুলগুলো না জানার কারণে, নাকি অসাবধানতায় হয়েছে- তা চিহ্নিত করে পরবর্তীতে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করার ওপর জোর দেন তিনি। সাধারণ জ্ঞান অংশের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একাধিক বই পড়ার পাশাপাশি বারবার মডেল টেস্ট দিয়ে অর্জিত তথ্য ঝালিয়ে নিতেন।
পরীক্ষার হলের কৌশল ও মানসিক প্রস্তুতি
পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনা ও প্রশ্ন বাছাই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর প্রথমে নিশ্চিত ও সহজ প্রশ্নগুলোর উত্তর আগে দিয়েছিলেন। কঠিন বা দ্বিধাদ্বন্দ্বের প্রশ্নগুলো প্রথম দফায় বাদ রেখে পরবর্তীতে ঠান্ডা মাথায় সেগুলোর সমাধান করেন। ৮৫ শতাংশ প্রশ্নের উত্তর আত্মবিশ্বাসের সাথে করার পর বাড়তি সময়ে প্রশ্নপত্র পুনরায় যাচাই করে তবেই উত্তরপত্র জমা দেন। পরীক্ষার হলে অন্য পরীক্ষার্থীদের সাথে নিজের তুলনা না করে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিজের প্রশ্নপত্র ও পরিকল্পনার ওপর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
হতাশা কাটিয়ে ওঠার মন্ত্র ও পরিবারের ভূমিকা
প্রস্তুতির শুরুর দিকে কোচিংয়ে কম নম্বর পেয়ে হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি মুনাদ। খারাপ ফলাফলকে যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি না ভেবে সেটিকে ভুল সংশোধনের তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার তাগিদ দেন তিনি। এই পুরো যাত্রায় মা ও পরিবারের নিঃশর্ত সাহস ও অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা ও বন্ধুদের সহযোগিতা তার সফলতার পথকে সুগম করেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নতুনদের জন্য পরামর্শ
আইন ও বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগকে বেছে নিয়েছেন মুনাদ। আগামী বছরের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রতি তার পরামর্শ- অন্যের পড়াশোনার পরিধি বা প্রাপ্ত নম্বরের সাথে নিজের তুলনা করে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ তৈরি না করে নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নতি করার চেষ্টা করা। ধারাবাহিকতা রক্ষা, বাস্তবসম্মত রুটিন মেনে চলা এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার মাধ্যমেই কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন তিনি।