শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৩ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিবেদনঃ একটি মেসেঞ্জার বার্তা ঘিরে বিরোধ, এরপর তরুণকে আটকে দফায় দফায় মারধর, হত্যার হুমকি এবং জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকার নবাবগঞ্জে ঘটনাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। প্রশ্ন উঠেছে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই কি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে শাস্তি দেওয়া যায়?
ঘটনাটি উপজেলার বকসনগর ইউনিয়নের টুকনীকান্দা এলাকার। নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করা ২৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ হৃদয় একই ইউনিয়নের বালুরচর গ্রামের শাহ আলমের ছেলে। তাঁর অভিযোগ, এক গৃহবধূর মেসেঞ্জারে ভুল করে বার্তা পাঠানো ও অনিচ্ছাকৃত ফোনকলকে কেন্দ্র করে তাঁকে আটকে রেখে কয়েক ঘণ্টা ধরে মারধর করা হয়। এ সময় তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া, জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় এবং সেই বক্তব্যের ভিডিও ধারণের অভিযোগও করেছেন তিনি।
হৃদয়ের ভাষ্য, গত ৫ অক্টোবর রাত ৮টা ১১ মিনিটে অন্য একজনকে বার্তা পাঠাতে গিয়ে ভুল করে এক গৃহবধূর মেসেঞ্জারে ‘হাই’ লিখে বার্তা চলে যায়। তাঁর দাবি, রাত ১১টা ২৬ মিনিটে ওই গৃহবধূ ‘হ্যালো’ লিখে উত্তর দেন। এরপর তাঁদের মধ্যে কয়েকটি সাধারণ কথাবার্তা হয়। একপর্যায়ে অনিচ্ছাকৃত ভাবে কল চলে গেলে তিনি তা সঙ্গে সঙ্গে কেটে দেন বলেও দাবি করেন হৃদয়। পরে ওই নারীর পরিচয় বুঝতে পেরে তিনি আর কথোপকথন এগিয়ে নেননি বলে জানিয়েছেন। তবে অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, হৃদয় ওই গৃহবধূকে অশ্লীল বার্তা ও ফোনকল দিয়ে বিরক্ত করছিলেন। গৃহবধূর স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, হৃদয়ের বিরুদ্ধে এলাকায় আগেও বিচার সালিশ হয়েছে।
দুই পক্ষের বক্তব্যে ঘটনার কারণ নিয়ে রয়েছে স্পষ্ট বিরোধ। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মেসেজ, কলের তথ্য, ভিডিও এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই জরুরি।

হৃদয়ের অভিযোগ, ঘটনার তিন দিন পর ৮ অক্টোবর সকালে যাত্রী নিয়ে অটোরিকশায় যাওয়ার সময় শুরগঞ্জ মসজিদের সামনে টুকনীকান্দা গ্রামের জলিল শিকদারের ছেলে সায়েদ তাঁর পথ আটকান। এ সময় তাঁর মোবাইল ফোন নিয়ে লক খুলতে বলা হয়। মেসেঞ্জারের কথোপকথন দেখার পর তাঁকে মারধর করা হয় এবং মোটরসাইকেলে করে টুকনীকান্দা এলাকায় তাঁর চাচার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
হৃদয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে তাঁর শ্যালক স্বপ্নীল (২৪), চাচাতো ভাই মঈন (২০), রিফাত (২৩), আরাফাত (২২)সহ আরও কয়েকজন জড়ো হন। এরপর তাঁকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর করা হয়। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম ও ফোলা দাগ হয় বলে অভিযোগ।
তিনি আরও দাবি করেন, তাঁকে গলাটিপে ধরা এবং মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করা হয়। আত্মরক্ষার জন্য বাম হাত দিয়ে প্রতিরোধ করতে গেলে কনুইয়ের কাছে আঘাত পেয়ে জখম হন। এ সময় হত্যার হুমকি, মামলা ও পুলিশের ভয় দেখিয়ে অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য করা হয় এবং ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
হৃদয়ের অভিযোগ, তাঁর ব্যবহৃত আইফোন ১১ প্রো ম্যাক্স, ব্লুটুথ, সানগ্লাস ও হাতঘড়ি ভেঙে ফেলা হয় এবং একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে যাওয়া হয়। এসব অভিযোগের প্রতিটি বিষয় তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। হৃদয়ের বাবা শাহ আলমের দাবি, ছেলেকে নিয়ে যেতে হলে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করতে হবে এমন চাপ ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে তিনি অভিযোগে স্বাক্ষর করেন বলে দাবি তাঁর।
শাহ আলম বলেন, পরে ছেলের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত জানার পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তাঁর অভিযোগ, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ছেলেকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার দাবি করেন।
হৃদয়ের দাবি, জলিল শিকদারের উপস্থিতিতেই তাঁকে মারধর করা হয়। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা যেত। কিন্তু কাউকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে হৃদয়কে মারধরের দৃশ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদকের কাছে দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে। ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, ধারণের সময় এবং এতে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে ভিডিওতে মারধরের দৃশ্য থাকার অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
এদিকে জলিল শিকদার, রিফাত ও আরাফাত তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্য অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ অস্বীকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করে আনা জরুরি।
নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু হানিফ জানান, এ ঘটনায় মারধরের শিকার তরুণ নিজেই বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।