শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬, ১১:৩৫ অপরাহ্ন
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি, ঢাকা ডেস্ক ॥
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরি ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ‘এসবি পরিবহনের’ একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে ডুবে গেছে। তবে নৌ-পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কড়াকড়িতে ফেরিতে ওঠার আগেই বাসের ৪২ জন যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়ায় এক ভয়াবহ প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছে সবাই। এই দুর্ঘটনা তদন্তে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজ শুক্রবার (০৫ জুন ২০২৬) দুপুরে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান।
যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
আজ শুক্রবার (০৫ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী এসবি পরিবহনের বাসটি দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরি ঘাটে নোঙর করে থাকা ‘কবরী’ নামের ফেরির কনভেনশন পকেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘাট কর্তৃপক্ষ জানায়, ফেরিতে ওঠার মুহূর্তে বাসটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনের র্যাম ভেঙে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে তলিয়ে যায়।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধারকাজে নামে ফায়ার সার্ভিস, নৌ-পুলিশ, থানা পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ এবং ডুবুরি দল। ঘটনার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর, সকাল ১১টা ৫৫ মিনিটে বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ডুবে যাওয়া বাসটি নদী থেকে টেনে তোলে।
চালক ও সহকারীর বক্তব্য
বাসের চালক ঝন্টু আলী (৪৫) ও হেলপার শাকিল হোসেন (৩৬) নদী থেকে সাঁতরে তীরে উঠলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস তাঁদের উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চালক ঝন্টু আলী বলেন:
“ফেরিতে ওঠার আগে নিয়ম মেনে সব যাত্রী নামিয়ে দিই। বাসে শুধু আমি আর হেলপার ছিলাম। হঠাৎ দেখি ব্রেক কাজ করছে না। আমি হেলপারকে দ্রুত নামতে বলে নিজেও নদীতে লাফ দিই।”
হেলপার শাকিল হোসেন জানান, ব্রেক ফেল করার কথা চালক জানানোর পর মুহূর্তের মধ্যে বাসটি নদীতে পড়ে যায়। এতে তিনি শরীরে ও পায়ে গুরুতর আঘাত পান। বাসের সুপারভাইজার আজমল হোসেন জানান, সকাল ৭টায় কুষ্টিয়া থেকে রওনা দিয়ে সাড়ে ৯টায় তাঁরা ঘাটে পৌঁছান। মাইকিং শুনে যাত্রীদের নামানোর পরপরই এই দুর্ঘটনা ঘটে।
বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের স্বস্তি
কুষ্টিয়া থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী টিউলিপ বলেন, “গাড়িভর্তি যাত্রী ছিল। ঘাটে এসে বাসের শেষ যাত্রী হিসেবে আমি নেমেছিলাম। আমার পরে আর কেউ ছিল না। এই সচেতনতাই আমাদের বাঁচিয়ে দিল।”
বিজিবি সদর দপ্তরের নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, “নৌ-পুলিশের তৎপরতায় যাত্রীদের নামানো হয়। অনেকে নামতে চাননি, তবে আজ না নামলে ২৫ মার্চের মতো বড় বিপর্যয় ঘটত। পুলিশের এই কড়াকড়িকে এখন ধন্যবাদ জানাই।”
প্রশাসনের তৎপরতা ও তদন্ত কমিটি গঠন
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন এবং গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস জানান, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে যাত্রীদের মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, পিপিএম (সেবা) এবং নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে যাত্রী ও চালকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, “ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রী নামানোর নির্দেশনা আমরা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছি। এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে।”
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন:
“আজ শুধু সচেতনতার কারণে ৪২টি প্রাণ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যের আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর পন্টুনে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নদীতে পড়ে ২৬ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়, যা আজ এক বড় বিপর্যয় রুখে দিল