শনিবার, ০৬ Jun ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
এনসিপির ছায়া বাজেট: আকার সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকা, ১২ খাতে ৭১ প্রস্তাব জামালপুরে সপ্তম শ্রেনীর শিক্ষার্থী ধর্ষন ঘটনায় থানায় মামলা ‎অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে লালমনিরহাটে সামাজিক অপরাধ পর্যবেক্ষণ কমিটির অবহিতকরণ সভা দৌলতদিয়ায় ব্রেক ফেল করে পদ্মা নদীতে বাস, প্রাণ বাঁচল ৪২ যাত্রীর: তদন্তে ২ কমিটি ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপ: এক নজরে ৪৮ দলের রণসজ্জা, সম্ভাবনা ও ম্যাচের সময়সূচি জলবায়ু ও ভূ-রাজনীতির সংকট: আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে যে ১৫ দেশ বিদ্যুতের বর্ধিত দাম প্রত্যাহার: মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের স্বস্তি ৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নিতে হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

এনসিপির ছায়া বাজেট: আকার সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকা, ১২ খাতে ৭১ প্রস্তাব

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা, জাতীয় ডেস্ক ॥
‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’- এই মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার বিকল্প বা ছায়া বাজেট ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ১২টি প্রধান খাতকে চিহ্নিত করে মোট ৭১টি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতিগত প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

আজ শুক্রবার (০৫ জুন ২০২৬) বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর রূপায়ণ টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ছায়া বাজেট কমিটির পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন:
হাসনাত আব্দুল্লাহ: এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও সংসদ সদস্য, ড. আতিক মুজাহিদ: ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও সংসদ সদস্য, আল ফয়সাল: কমিটির উপ-প্রধান, আলাউদ্দিন মোহাম্মদ: এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব, সজিব ওয়াহিদ: জাতীয় শ্রমিক শক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক।

অনুষ্ঠানের শুরুতে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। এরপর ড. আতিক মুজাহিদ ও আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল যৌথভাবে ১২টি খাতের বিস্তারিত ৭১টি প্রস্তাবনা পাঠ করেন।

১২টি প্রধান খাত ও বাজেটের রূপরেখা
এনসিপির প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ৬২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা বা ৭.৮৭ শতাংশ বেশি। দলটির পক্ষ থেকে ১৩ শতাংশ নামমাত্র প্রবৃদ্ধি (নমিনাল গ্রোথ) ধরে জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে চলমান ৯.২ শতাংশ মূল্যস্ফীতিকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮ শতাংশে এবং পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৬ শতাংশে নামিয়ে এনে স্থিতিশীল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

যে ১২টি খাতকে কেন্দ্র করে এই বাজেট সাজানো হয়েছে, সেগুলো হলো:

১. রাজস্ব ও সামষ্টিক অর্থনীতি, ২. রাজস্ব কাঠামো ও করজাল সম্প্রসারণ, ৩. কর ন্যায়বিচার ও সংস্কার, ৪. শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, ৫. স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা, ৬. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, ৭. পরিষ্কার জ্বালানি ও পরিবেশ, ৮. নারী, যুব ও অন্তর্ভুক্তি, ৯. সরকারি কর্মচারী ও শাসন সংস্কার, ১০. ব্যাংকিং, মূলধন বাজার ও অর্থায়ন, ১১. প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা এবং ১২. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

অর্থনৈতিক ভারসাম্য: রাজস্ব ও সামষ্টিক অর্থনীতি খাতে এনসিপির মূল প্রস্তাব হলো- সামাজিক খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতির সামগ্রিক ভারসাম্য কঠোরভাবে বজায় রাখা।

অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা
প্রস্তাবনা উপস্থাপনের আগে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া একটি চরম সংকটাপন্ন ও ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি। প্রতিবছর জ্বালানি আমদানিতেই ১২ বিলিয়ন ডলারের (দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি) বিপুল অর্থ চলে যাচ্ছে। এর ওপর অপব্যবহারমূলক ও অযৌক্তিক ক্যাপাসিটি চার্জের বিশাল বোঝাতো রয়েছেই।”

তিনি অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পরিসংখ্যান বিকৃত করে জনগণের কাছ থেকে অর্থনীতির আসল সত্য লুকিয়েছিল। সেই সংকটকালে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নেয়। যেমন- মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ডলারের বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ এবং ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা আনতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করা। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার এসে সেই অধ্যাদেশ বিকৃত করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার অবকাঠামোর চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দিলেও বর্তমান সরকার সেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে যেসব বিতর্ক সামনে এসেছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে (মাত্র ৬.৭ শতাংশ) রয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো আর পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি।

সরকারের কাছে এনসিপির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি
বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন পলিসি নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন:

সরকার ঘোষিত ১ কোটি ৪০ লাখ ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারীর’ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস কী? এই অর্থ কি অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে কেটে নেওয়া হবে, নাকি নতুন কোনো খাত থেকে আসবে- তা স্পষ্ট করা দরকার।

জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা সরকারের আছে কি, নাকি দেশ আজীবন আমদানিনির্ভরই থেকে যাবে?

প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে ঠিক কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তা দেশের মানুষ জানতে চায়।

সমতাভিত্তিক অর্থনীতির অঙ্গীকার
বক্তব্যের শেষাংশে হাসনাত আব্দুল্লাহ এনসিপির মূল ভাবনা ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা একটি বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক ও মানবিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার দায়বদ্ধতার সম্পর্ককে আমরা আরও মজবুত করতে চাই। আমাদের নীতিতে ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি উৎপাদকদের স্বার্থও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে। যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের পুরস্কৃত ও উৎসাহিত করা হবে এবং করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সেবাগুলো সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে।”

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা কেবল খাতা-কলমে বা পরিসংখ্যাননির্ভর কোনো নামসর্বস্ব লোকদেখানো বাজেট দেখতে চাই না; আমরা এমন একটি বাস্তবমুখী বাজেট চাই, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com