রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৩৮ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধি, নবাবগঞ্জ ॥
সারাবছর হাতে ক্যামেরা, কাঁধে ব্যাগ আর চোখে খবরের সন্ধান। কখনো ভোরে, কখনো গভীর রাতে মানুষের খবর পৌঁছে দিতে ছুটে চলাই যাদের জীবন। সেই সাংবাদিকরাই এবার একদিনের জন্য ভুলে গেলেন খবরের দৌড়। নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে ভেসে মেতে উঠলেন হাসি-আড্ডা, গল্প আর স্মৃতিচারণে।
কেউ ব্যস্ত নদীর সৌন্দর্য দেখতে, কেউ পুরোনো দিনের গল্পে, কেউ আবার সহকর্মীদের সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডায়। পেশাগত প্রতিযোগিতা, সময়ের চাপ কিংবা প্রতিদিনের ব্যস্ততা সবকিছু যেন সেদিন দূরে সরে গিয়েছিল। নদীর বুকে তৈরি হয়েছিল সাংবাদিকদের এক ভিন্ন জগত যেখানে খবরের শিরোনামের বদলে ছিল হাসি, আনন্দ আর সৌহার্দ্যের গল্প।

নবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) নিউ ঢাকা সিটিতে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী নৌভ্রমণ এমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজনের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকদের একত্র করেছিল। নৌযানে নদীভ্রমণের পাশাপাশি প্রাণখোলা আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা, স্মৃতিচারণ ও নানা আনন্দঘন আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সময়।
প্রতিদিন একই পেশায় কাজ করলেও ব্যস্ততার কারণে অনেক সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয় কেবল সংবাদকেন্দ্রিক বিষয়ে। কারও সঙ্গে দেখা হয় ঘটনাস্থলে, কারও সঙ্গে ফোনে, আবার কারও সঙ্গে যোগাযোগ শুধু একটি সংবাদের প্রয়োজনে। তাই নদীর বুকে এই একদিনের আয়োজন যেন সেই পেশাগত দূরত্বের দেয়াল ভেঙে সবাইকে নিয়ে আসে আরও কাছাকাছি।

নবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকরা সারা বছর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের ব্যস্ততায় নিজেদের বিনোদনের কথা অনেক সময় ভুলে যেতে হয়। ‘সাংবাদিকরা শুধু খবরের মানুষ নন, তারাও মানুষ। তাদের কর্মব্যস্ততার মাঝে আনন্দ ও প্রশান্তির সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ ধরনের আয়োজন সহকর্মীদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও শক্তিশালী করে।’ ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি।
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কাজী সোহেল বলেন, প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার বাইরে সবাইকে নিয়ে কিছুটা সময় আনন্দ ও বিনোদনের মধ্যে কাটাতে পেরে তারা আনন্দিত। একই পেশায় থেকেও ব্যস্ততার কারণে অনেক সহকর্মীর সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডার সুযোগ হয় না। নৌভ্রমণের এই আয়োজন সেই সুযোগ তৈরি করেছে। আয়োজন সফল করতে সহযোগিতাকারী সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজহারুল হক বলেন, সংবাদ সংগ্রহের ব্যস্ততার মধ্যে এমন আয়োজন সত্যিই অন্যরকম অনুভূতি দিয়েছে। নদীর নির্মল পরিবেশে সহকর্মীদের সঙ্গে নির্ভার সময় কাটানো মানসিক প্রশান্তি দিয়েছে। কর্মক্ষেত্রের বাইরে একসঙ্গে সময় কাটালে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। এমন আয়োজন সাংবাদিকদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করবে।
নৌভ্রমণে প্রেস ক্লাবের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাবেক নেতৃবৃন্দসহ সদস্য ও কর্মরত সাংবাদিকরা অংশ নেন। নদীর বুকে চলতে চলতে কেউ উপভোগ করেন প্রকৃতির সৌন্দর্য, কেউ মেতে ওঠেন গল্পে, কেউ স্মৃতির ঝাঁপি খুলে শোনান পুরোনো দিনের কথা। হাসি-ঠাট্টায় কখন যে সময় গড়িয়ে যায়, তার হিসাব রাখারও যেন প্রয়োজন হয়নি কারও।
সাংবাদিকদের জীবন সাধারণত অন্যের গল্পে ভরা। কিন্তু এদিনের গল্পটি ছিল তাদের নিজেদের। কোনো ব্রেকিং নিউজ নেই, নেই ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়ার তাড়া, নেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবাদ পাঠানোর চাপ। ছিল শুধু সহকর্মীদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকার আনন্দ।

নবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের এই আয়োজন তাই শুধু একটি নৌভ্রমণ নয়; এটি ছিল কর্মব্যস্ত সাংবাদিকদের জন্য একদিনের মানসিক অবকাশ এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার প্রয়াস। পেশাগত দায়িত্বের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর যে বন্ধন সাংবাদিকতা পেশাকে শক্তি দেয়, নদীর বুকে সেই বন্ধনই যেন নতুন করে দৃশ্যমান হয়ে উঠল।
দিন শেষে নৌযান হয়তো তীরে ফিরেছে, থেমেছে হাসি-আড্ডার আসর। কিন্তু নদীর বুকে কাটানো সেই নির্ভার দিনটি সাংবাদিকদের কর্মব্যস্ত জীবনে রেখে গেছে এক টুকরো আনন্দ, নতুন উদ্যম আর সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের এক উজ্জ্বল স্মৃতি।