রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন
লিয়াকত হোসাইন লায়ন, জামালপুর প্রতিনিধি॥ প্রতি বছর ঘুরে আসে কোরবানি ঈদ। ঈদকে ঘিরে চারিদিকে আনন্দ উৎসব ও চলছে কোরবানির পশু কেনার ধুম। মানুষ ছোটছেন বিভিন্ন সরঞ্জামাদী বানাতে কামারশালায়। বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রাংশের প্রভাবে কামার শিল্পের দুর্দিন চললেও মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন এই হস্তশিল্পের কারিগররা। কেউ নতুন সরঞ্জামাদি তৈরিতে আবার কেউ পুরাতন সরঞ্জামের মরিচা ছাড়িয়ে দেয়ার কাজে ব্যস্ত। ঈদের দিন ভোরবেলা পর্যন্ত চলবে তাদের এ ব্যস্ততা।
সরেজমিনে জামালপুরের ইসলামপুর পৌর শহরের ফকিরপাড়ার কামারপাড়া, চাড়িয়া পাড়া, রেলগেইট, মধ্যে দরিয়াবাদ, দিঘলকান্দি, গংগাপাড়া, মহলগিরি বাজার, নাপিতের চর বাজার, চিনাডুলী ইউনিয়নের গুঠাইল বাজারে দা, বটি, চাপাতি, ছুরি বানাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। জ্বলন্ত আগুনের তাপে কামারদের কপাল থেকে ঘাম ঝরছে। কয়লার দগদগে আগুনে পুড়িয়ে পিটিয়ে তৈরি করছেন, দা, বটি, ছুরি, কুরাল, চাকুসহ ধারালো হাতিয়ার। কামারের সহযোগী লোহার শিকল টানছেন, কেউবা আগুনে কয়লা দিচ্ছেন, পুড়ছে কয়লা, জ্বলছে লোহা, অগ্নিশিখায় পুড়ে যখন লোহা লাল হয়ে যাচ্ছে সেটাকে তুলে দেশীয় অস্ত্রে তৈরির জন্য পিটাচ্ছে কামার ও সহযোগী। ঠিক তখনি ছন্দে ছন্দে টুং-টাং ধ্বনিতে মুখরিত হচ্ছে কামারপাড়া। নিমিষেই তৈরি করছে চাপাতি, দা, বটি, কাটারি, ছুরিসহ কুরবানির পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতের লৌহজাত নানাবিধ সরঞ্জাম। অনেকেই আবার পুরাতন দা, ছুরিগুলো মেরামতের জন্য কামারের দোকানে দাড়িয়ে আছেন। ঈদের আরো কয়েকদিন বাকি থাকলেও জমে উঠেছে কামারীর দোকান। কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে হাতুড়ি পেটার কাজ। তাই যেন দম ফেলারও সময় নেই কামারদের। নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাজ করছেন কামাররা।
কয়েকজন কামারের কথা বলে জানা যায়, পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি ৮শত থেকে ১হাজার টাকা, দা ৬শত থেকে ৯শত টাকা, বটি ৭শত থেকে ৯শত, পশু জবাইয়ের ছুরি ৭শত থেকে ১ হাজার টাকা, চাপাতি ৮শত থেকে ১২শত টাকায় বিক্রি করছে। ঈদের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, টুং টাং শব্দ ততই বেড়ে চলেছে। ক্রেতা সাধারণদের ভীড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে কামারদের দোকানগুলো। কামারশিল্পীদের দম ফেলার ফুসরত নেই।

ইসলামপুর পৌর শহরের ফকিরপাড়া কামারপাড়া ও চাড়িয়াপাড়া কামারপাড়া এলাকায় কামার শিল্পীরা সকলেই হিন্দু সম্প্রাদায়ের। তাদের সকলেরই পত্তিক সুত্রে পাওয়া এ পেশা। বিপ্লব কর্মকার বলেন, কোরবানি ঈদ একটু ব্যবসা হয়। সারা বছর তেমন উপার্জন না থাকায় ছেলে মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হয়। তার পরেও কয়লা দাম একটু বেশি হওয়ায় দামে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। কয়লা পরিবর্তে গ্যাস দিয়ে কাজ করলে ভাল হইতো। এই সামর্থ আমাদের নাই।
চাড়িয়াপাড়ার জগদিশ কর্মকার বলেন, বাপ দাদার পৈত্তিক পেশা করে জীবন বাঁচানো খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের জন্য ডিজিটাল কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি সরকার। তাই পেটের দায়ে পৈত্তিক পেশা ছেড়ে বাধ্য হয়ে আমাদের অনেকেই এখন অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।
ফকির পাড়া কামার শিল্পী সুদিন কর্মকার বলেন, সারা বছর কাজ না থাকায় মুসলমানদের ধর্মীয় এ উৎসবে অপেক্ষায় থাকি। আগের মত আর তেমন কাজ নেই। এখন আমাদের এ পেশায় নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বাপদাদার পেশা এ পেশাই জীবন বাচাঁই, ছাড়তেও পারিনা।
দোকানে আসা ক্রেতা লিপন মিয়া বললেন, গরু কোরবানির জন্য একটা ছুরি অর্ডার দিয়েছি। ঈদ আসলে কামাররা তাদের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোরবানির পশু কেনার যে সময় লাগে এখন তার চেয়ে বেশি সময় সরঞ্জামাদী বানাতে ব্যয় হয়। এতক্ষণ অপেক্ষায় থেকে টুং টাং শব্দে আমরা অস্থির আর উপার্জনে কামাররা ব্যস্ত।