বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ অপরাহ্ন

জামালপুরে ১২৮ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শুন্য! দিন দিন ঝড়ে পড়ছে শিক্ষার্থী

লিয়াকত হোসাইন লায়ন, জামালপুর প্রতিনিধি॥ জামালপুরের ইসলামপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উপজেলা শিক্ষা অফিসে জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। উপজেলার ১৭৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৮ টিতে নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। পাশাপাশি ৫৬ জন সহকারী শিক্ষক এবং তিনটি সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার (এটিও), একজন উচ্চমান সহকারী ও অফিস সহকারী পদ খালি রয়েছে। শিক্ষক সংকট, তদারকির অভাব এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দিন দিন ঝরে পড়ছে।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট থাকায় বিদ্যালয় গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সহকারী শিক্ষককে পাঠদানের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে বাড়তি চাপ এবং শিক্ষার্থীরাও কাঙ্খিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামপুরে মোট ১৭৭টি সরকারি এবং বেসরকারী, কেজিসহ ২৮৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৭৯টি সরাসরি সরকারি এবং ৯৮টি নিবন্ধিত বিদ্যালয় পর্যায়ক্রমে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২৮৫টি বিদ্যালয়ের ৫১ হাজার ৮শত ৭০জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অনুমোদিত সহকারী শিক্ষকের পদ ৯৩৬টি স্থলে ৮৮০ জন কর্মরত থাকলেও ৫৬টি পদ শূন্য রয়েছে। ১৭৭টি প্রধান শিক্ষকের পদের মধ্যে মাত্র ৪৮ জন কমর্রত রয়েছেন। ফলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে ১২৮টি বিদ্যালয়। এছাড়াও উপজেলায় জাতীয়করণ প্রস্তাবিত ৯৮টি এবতেদায়ী মাদরাসা ও ২৫টির মত কওমি মাদরাসাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজস্ব খাতে অর্ন্তগত ২৮টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় পদোন্নতি প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষকদের কাউকে চলতি দায়িত্ব এবং কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব থাকায় নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজও সামলাতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকের ৫৬টি পদ শূন্য থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতও ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক সংকটের কারণে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একাধিক শ্রেণির পাঠদান ও অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে শিক্ষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে ঘুরে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। ২২ সেপ্টেম্বর উপজেলার বীর সিংহ সপ্রাবিতে ৬৬জন শিক্ষার্থীর স্থলে ১০জন, মোহাম্মদপুর বালুচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক ও ৬ জন শিক্ষার্থীর দেখা মিলেছে। এছাড়াও, পূর্ব পোড়ার চর সপ্রাবিতে ৮৯শিক্ষার্থীর স্থলে ৪জন, দক্ষিন মোহাম্মদপুর, সাজলের চর প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে চার থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী উপস্থিতি থাকলেও দক্ষিণ চিনাডুলী ও হরিণধরা সপ্রাবিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী শুন্য দেখা গেছে। এছাড়াও এবতেদায়ী মাদরাসা গুলোর জাতীয় করনের আশায় নামমাত্র স্থাপনা করে রাখা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষকের পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত করে বিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে সহকর্মীরা যথাযথভাবে মানতে চান না। আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়েন। সংকট নিরসন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন।

অভিভাবক রিপন মিয়া বলেন, উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কোনো কোনো শিক্ষক সময়মতো বিদ্যালয়ে না আসায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এ কারণে অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদরাসায় ভর্তি করাচ্ছেন।

শিক্ষার্থীর উপস্থিতির বিষয়ে বীর সিংহ সপ্রাবি প্রধান শিক্ষক রেহেনা খাতুন বলেন, আশে পাশে একাধিক বিদ্যালয় গড়ে উঠায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিনদিন কমে যাচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের মাদ্রাসাতে ভর্তি করাচ্ছেন। যারা স্কুলে আসে টিফিনের সময় বাড়িতে গেলে আর আসতে চায়না, অভিভাবদের কারণে শিক্ষার্থীরা দিনদিন স্কুলের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা স্বর্ণজীব দেব বলেন,আমি সবে মাত্র যোগদান করেছি। বিভিন্ন অনিয়ম খোঁজ খবর রাখছি। তবে ১৭৭টি সরকারী বিদ্যালয় নিয়মিত তদারকি করা অত্যন্ত কঠিন। শিক্ষার মানোন্নয়নে স্থানীয় সচেতন মহল ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, যমুনা চরাঞ্চলসহ রাজস্ব খাতে অন্তর্ভক্ত অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনিয়ম ও অনুপস্থিতি দীর্ঘদিনের। অনেক শিক্ষক জেলা সদরে বসবাস করে নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষক সংকট নিরসন, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ইসলামপুরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থুবড়ে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com