বৃহস্পতিবার, ১১ Jun ২০২৬, ০৭:০১ পূর্বাহ্ন
হোসাইন মোহাম্মদ সাগর |
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড এখনো আইনত বৈধ এবং প্রায়ই আদালতের রায়ে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ বিশ্বজুড়ে যেখানে মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির দিকেই দেশগুলো এগোচ্ছে, বাংলাদেশে এ বিষয়ে আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোর নীরবতা।
জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার খবর প্রচারিত হলেও, মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে বিশ্বব্যাপী চলমান আন্দোলন বা এর পেছনের মানবাধিকার প্রশ্নগুলো নিয়ে তেমন কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয় না। শুধু বিদেশি সংবাদমাধ্যমে জিম্বাবুয়ে, ঘানা, ফিলিপাইন বা এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়। অথচ সেসব ঘটনার প্রতিধ্বনি খুব কমই আসে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে।
এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক নাইমা হক বলেন, “মৃত্যুদণ্ড বিলোপের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক বিষয়ে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলোর অনীহা খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি যেন ট্যাবু হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় উল্লেখযোগ্য। অথচ প্রতিটি রায়ের খবরে বিচারপ্রাপ্তির দাবি যতটা জোরদারভাবে উঠে আসে, ঠিক ততটাই অনুপস্থিত থাকে মৃত্যুদণ্ডের মানবিক, আইনগত বা নৈতিক বিতর্ক।
একইভাবে, অধিকাংশ মানবাধিকার বা সামাজিক সংগঠন যেখানে ধর্ষণ বা সহিংসতা বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত, সেখানে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দাবি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রাজনৈতিক সংকোচ, জনমতের চাপ এবং সামাজিকভাবে ‘ফাঁসি চাই’ সংস্কৃতির প্রভাব কাজ করছে।
ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, “আমাদের সমাজ এখনো মনে করে, প্রতিটি ভয়ংকর অপরাধের একমাত্র সমাধান ‘ফাঁসি’। এই অবস্থানে পাল্টে আনার জন্য মিডিয়া ও এনজিওগুলোর সামনে অনেক বড় দায়িত্ব ছিল, যেটা তারা পালন করছে না।”
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বেশকিছু মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে আইনত বা কার্যত। অনেক দেশই মৃত্যুদণ্ডকে অমানবিক ও অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় শাস্তি ভুল রায় বা বিচারিক দুর্বলতার ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
অথচ বাংলাদেশে এখনো গণমাধ্যম বা সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে এই গুরুতর বিষয়ে নেই কোনো ধারাবাহিক প্রতিবেদন, প্রচার বা জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে কিছু একাডেমিক গবেষণা, যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের কিছু উদ্যোগ, আংশিক আলোচনা তৈরি করেছে।
অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, “মৃত্যুদণ্ড শুধু শাস্তি নয়, এটি এক ধরণের প্রতীক—কঠোর রাষ্ট্রব্যবস্থার। এই প্রতীকের ভাঙন সহজ নয়। তাই এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে মিডিয়া ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সাহসী ও মানবিক ভূমিকা নিতে হবে।”
সার্বিকভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা বা পুনর্মূল্যায়নের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। নাগরিক সমাজ, মিডিয়া ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চুপচাপ অবস্থান এই বিষয়টিকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে।
হোসাইন মোহাম্মদ সাগর
মৃত্যুদণ্ড বিলোপ বিষয়ক মানবাধিকার কর্মী ও লেখক।
ইমেইল: sendhusagar@gmail.com