শনিবার, ২০ Jun ২০২৬, ১০:৩৬ অপরাহ্ন
হোসাইন মোহামামদ সাগর
যুগ বদলেছে, সমাজ বদলেছে। অনেক দেশই ধাপে ধাপে ফাঁসির মতো কঠোর শাস্তি থেকে সরে এসেছে। ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই এখন মৃত্যুদণ্ড নেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে বাংলাদেশ কি তাদের পথে হাঁটছে? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশে-বিদেশে।
এই প্রেক্ষাপটে কথা হয় আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে। একান্ত আলাপে খোলামেলা আলোচনায় উঠে আসে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, জনমত, আন্তর্জাতিক চাপ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পথে হাঁটছে?
আইনমন্ত্রী: ‘না, আমরা সে পথে হাঁটছি না। আমি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদের সাফ জানিয়েছি—যে অপরাধগুলোর জন্য বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেগুলো আমরা পরিবর্তন করছি না। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবতা ও জনগণের নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করেই নেওয়া হয়েছে।’
প্রশ্ন: তবে কি ভবিষ্যতের আইনগুলোতে আর মৃত্যুদণ্ড থাকবে না?
আইনমন্ত্রী: ‘আমরা নতুন কোনো আইন করতে গেলে সেখানে মৃত্যুদণ্ড রাখার ব্যাপারে দ্বিধা করব—এ কথা ঠিক। কারণ আজকের বিশ্ব বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, মৃত্যুদণ্ড রয়েছে এমন দেশে কেউ আশ্রয় চাইলে তাকে আর ফেরত পাঠায় না। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনতে গিয়ে এই সমস্যায় পড়েছি। তাই যেখানে সম্ভব, সেখানে যাবজ্জীবন সাজা রেখে কাজ চালানো যেতে পারে। যেমন—ফরমালিন ব্যবহারবিষয়ক আইনে মৃত্যুদণ্ড না রেখে যাবজ্জীবন রাখা উচিত বলে মনে করি।’
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক মহলের চাপ কি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে?
আইনমন্ত্রী: ‘আন্তর্জাতিক চাপ আছে, সেটা অস্বীকার করি না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বহুবার বলেছে—মৃত্যুদণ্ড তুলে নেওয়ার কথা। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়েও তাদের আপত্তি ছিল। কিন্তু আমাদের বিচার ব্যবস্থায়, বিশেষ করে বড় অপরাধের ক্ষেত্রে, এখনো মৃত্যুদণ্ডকে আমরা অপরিহার্য বলে মনে করি।’
প্রশ্ন: ধর্ষণের মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী?
আইনমন্ত্রী: ‘এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনমনে এই দাবি প্রবল হলেও, আমরা শুধু আবেগ দিয়ে আইন করি না। আমরা বিচার করে দেখি—ফাঁসির বিধান রাখলে অপরাধ কমবে কি না। যেসব অপরাধ অত্যন্ত গর্হিত, সেসব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড রাখা হতে পারে, তবে তা অবশ্যই তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে।’
প্রশ্ন: অর্থাৎ জনমত থাকলেও অপরাধ দমনের কার্যকারিতা বিচার করে সিদ্ধান্ত?
আইনমন্ত্রী: ‘অবশ্যই। জনগণ যা চায়, সেটাই আইন হবে—এই ধারণা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। আইন হতে হবে তথ্যভিত্তিক, কার্যকর এবং মানবিক। আমরা বিচার করে দেখি—এই শাস্তি দিলে অপরাধ থামবে কি না। একমাত্র তখনই মৃত্যুদণ্ড বিবেচনায় আনা হবে।’
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিতর্ক একদিকে, আর বাংলাদেশের বাস্তবতা অন্যদিকে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বক্তব্য স্পষ্ট—দেশের আইনি কাঠামোতে এখনই মৃত্যুদণ্ড বিলোপের সুযোগ নেই। তবে ভবিষ্যতের আইনে অপরাধ ও বিচার বিশ্লেষণ করে, মৃত্যুদণ্ডের জায়গায় বিকল্প সাজা বিবেচনার পথ খোলা রাখছে সরকার। এই ভারসাম্যের মধ্যেই বাংলাদেশ খুঁজছে ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের সমন্বয়।