রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫২ অপরাহ্ন

৭ মাসে ১৭ বার প্রতারণা করেছে বিএনপি: হাসনাত আবদুল্লাহ

একুশের কণ্ঠ প্রতিবেদন:: জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিএনপি সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তার দাবি, সনদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করে গত সাত মাসে ১৭ বার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বিএনপি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এবি পার্টির আয়োজনে ‘জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার এক বছর সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় এ অভিযোগ করেন তিনি।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, গণভোটের মাধ্যমে ৩০০ সংসদ সদস্যকে ১৮০ দিনের জন্য সংবিধান সংস্কারের যে ক্ষমতা জনগণ দিয়েছিল, তা কাজে লাগানো হয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলের একাংশ মেনে নেওয়া হলেও গণভোটের ফলাফল উপেক্ষা করা হয়েছে। সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথও নেননি। ফলে, জুলাই সনদ কার্যত আলঙ্কারিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, বিএনপি বারবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সনদে যেসব প্রস্তাব ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।

সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এনসিপির এই নেতা বলেন, সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিষয়গুলো পরিবর্তন করা হলে ভবিষ্যতে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অতীতে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে হাইকোর্টের কয়েকটি বেঞ্চ বিভাগীয় শহরে স্থানান্তরের উদ্যোগ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বাতিল হয়েছিল।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত সংশোধনীও আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কী? এ কারণে সংবিধান সংস্কারের জন্য পৃথক সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে তাদের অবস্থান ছিল। জনগণের দেওয়া ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করা উচিত ছিল। বিএনপি বারবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সনদে যেসব প্রস্তাব ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন সংশোধনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জুলাই সনদে দুদক আইনের ৩৩(ক) ধারা বিলুপ্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো অঙ্গীকার করেছিল। সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করতে সরকারের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা দূর করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সেটি আইনে পরিণত করেনি।

দুদকের চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্যের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত। তার অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের পরামর্শক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম গড়ে উঠছে। এ ধরনের পরিস্থিতি স্বার্থের সংঘাত ও দুর্নীতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জুলাই সনদের ৬৯ নম্বর প্রস্তাবে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের কথা ছিল, উল্লেখ করে এই তরুণ সংসদ সদস্য বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিল। কিন্তু, সরকার এ বিষয়ে অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

পুলিশের বদলি ও পদায়নে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কিংবা পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদায়ন পেতেও বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, জুলাই সনদের ৬৭ নম্বর প্রস্তাবে হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগ পৃথক করে সরকারি নিরীক্ষা কার্যক্রমের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি না থাকলেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে তার অভিযোগ।

সনদের ৬২ নম্বর প্রস্তাবে তথ্য অধিকার আইন সংশোধনের কথা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, নাগরিকেরা যাতে সহজে সরকারি তথ্য পেতে পারেন এবং সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করা যায়, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে সরকার স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করেছে।

হাসনাত বলেন, এসব প্রস্তাবের বিষয়ে বিএনপির কোনো আপত্তি বা ভিন্নমত ছিল না। তারপরও সেগুলো বাস্তবায়ন না করায় জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির এই নেতা বলেন, সরকার একদিকে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলছে, অন্যদিকে সনদে উল্লেখ থাকা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে, সরকারের বক্তব্য ও কাজের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে।

জুলাই সনদের ৬৪ নম্বর প্রস্তাবে গণহত্যা ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের তদন্তের জন্য স্বাধীন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তার অভিযোগ, সরকার গঠনের পরও এ বিষয়ে কার্যকর তদন্ত শুরু হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে আরও ক্ষমতাবান করা হচ্ছে।

সনদের ৬১ নম্বর প্রস্তাবে বিচারকদের রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যকে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল বলেও জানান তিনি। তার দাবি, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।

বিচারক ও আদালতের কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী প্রতি তিন বছর পরপর ওয়েবসাইটে প্রকাশের প্রস্তাব বাস্তবায়নেও সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন হাসনাত।

জুলাই সনদের ৫২ নম্বর প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে পৃথক করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সেই উদ্যোগ বাতিল করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

হাসনাত বলেন, এসব প্রস্তাবের বিষয়ে বিএনপির কোনো আপত্তি বা ভিন্নমত ছিল না। তারপরও সেগুলো বাস্তবায়ন না করায় জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

রাজনীতিবিদদের পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং বিদেশে বসবাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত সংস্কারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় দেশের বাইরে থাকেন। এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের জীবনযাপনের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তার অভিযোগ, রাজনীতিকে জনসেবার পরিবর্তে ব্যবসার উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, প্রভাব খাটানো এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, জনগণ জুলাই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন, সুশাসন ও জবাবদিহির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা সেই প্রত্যাশার পরিপন্থী। আমরা এমন জুলাই সনদ চাইনি, যেখানে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় তা উপেক্ষা করা হবে। জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানান তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com