বৃহস্পতিবার, ১১ Jun ২০২৬, ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন

স্মার্ট কার্ডের ‘বিকল্প ভাবনা’ এনআইডি ডিজির: আসছে নতুন আইডি ‘ekid’

ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা ॥
নাগরিকদের জন্য উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড) চালুর উদ্যোগ নেওয়ার প্রায় দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো সব নাগরিকের হাতে এই কার্ড পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে স্মার্ট কার্ডের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) সদ্য দায়িত্ব নেওয়া মহাপরিচালক (ডিজি) এ এইচ এম আনোয়ার পাশা। ইসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান স্মার্ট কার্ড প্রকল্প বন্ধ করে ‘একআইডি’ (ekid) নামে নতুন একটি কার্ডের পরিকল্পনা কমিশনে উপস্থাপনের জন্য তিনি একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন।

চিপভিত্তিক কার্ডের বদলে ক্লাউড ও ডিজিটাল আইডি
ইসি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য চিপভিত্তিক স্মার্ট কার্ড উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এছাড়া শুরুতে ‘একটি মাত্র কার্ডের মাধ্যমে সব সেবা নিশ্চিত করার’ যে লক্ষ্য ছিল, তা-ও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন ডিজির তৈরি প্রস্তাবনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক পরিচয় ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে চিপের পরিবর্তে ‘ক্লাউডভিত্তিক ডিজিটাল আইডি’ অথবা স্মার্টফোনভিত্তিক ‘ডাইনামিক ভেরিফিকেশন’ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আমেরিকা ও ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর আইডির সুবিধা-অসুবিধাও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শঙ্কা
স্মার্ট কার্ডের চিপে নাগরিকের পেশা, ঠিকানা, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, আয়কর সনদ, ব্যাংক ও এটিএম সেবাসহ প্রায় ২৫ ধরনের তথ্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল। এনএফসি প্রযুক্তিসম্পন্ন এই চিপটি শক্তিশালী এনক্রিপশনের মাধ্যমে সুরক্ষিত। তবে বাস্তবে এখন এনআইডি মূলত পরিচয় শনাক্তকরণ ও নম্বরভিত্তিক যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এদিকে সম্পূর্ণ ফিজিক্যাল (কার্ড) ব্যবস্থা বাদ দিয়ে মোবাইল বা ক্লাউড-নির্ভর আইডি চালু করা হলে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ, যারা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে এখনো দক্ষ নন, তারা চরম ভোগান্তিতে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের একাংশ। তাদের মতে, স্মার্ট কার্ডের কোনো কার্যকর বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।

মহাপরিচালক ও ইসি সচিবের বক্তব্য
তবে এমন কোনো পরিকল্পনার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন এনআইডি ডিজি এ এইচ এম আনোয়ার পাশা। তিনি জানান,

“এরকম কোনো পরিকল্পনা আমার নেই। আমি মাত্র যোগদান করেছি এবং সবকিছু বোঝার চেষ্টা করছি। বোঝার পর পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব। কর্তৃপক্ষ যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, সেভাবেই বাস্তবায়িত হবে।”

অন্যদিকে স্মার্ট কার্ডের চিপ ব্যবহার না হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হওয়া প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন,

“চিপে ডেটা আছে, কিন্তু চিপ রিডারটা নেই- এই সত্যিটা আমি স্বীকার করছি। চিপে নাম, ছবি, জন্মতারিখ, রক্তের গ্রুপসহ কিছু মৌলিক ডেটা রয়েছে যা পরিবর্তন হয় না। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী এই ডেটা ব্যবহার করতে পারে।”

তিনি আরও জানান, স্মার্ট কার্ড বা আইডিইএ প্রকল্প আগামী নভেম্বর পর্যন্ত আছে, এরপর কী হবে তা পরবর্তীতে ভাবা হবে।

স্মার্ট কার্ড বিতরণের বর্তমান চিত্র
ইসির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ইসি মোট ৮ কোটি ৬৭ লাখ ১২ হাজার ২৬৬টি স্মার্ট কার্ড পেয়েছে। এর মধ্যে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৩১ হাজার ২৪৬টি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে এবং ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮১ হাজার ২২টি কার্ড এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। দেশের ৫২২টি উপজেলার মধ্যে ৪০৪টি উপজেলায় বিতরণ শেষ হয়েছে, ১টি উপজেলায় বিতরণ স্থগিত রয়েছে, ২টি উপজেলায় কার্ড প্রিন্ট হলেও বিতরণ হয়নি এবং ১১৫টি উপজেলায় এখনো কার্ড প্রিন্টই করা হয়নি।

প্রকল্পের ইতিহাস ও বর্তমান সংকট
২০০৭-২০০৮ সালে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘আইডিইএ’ (স্মার্ট কার্ড) প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৫ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘অবার্থার টেকনোলজিস’-এর সঙ্গে ৯ কোটি কার্ডের চুক্তি হলেও নির্ধারিত সময়ে কার্ড দিতে না পারায় ২০১৭ সালে চুক্তি বাতিল ও জরিমানা করা হয়। অবার্থার ১.৫১ ডলার দরে ৭ কোটি ৭৩ লাখ কার্ড সরবরাহ করেছিল।

বর্তমানে দেশে ভোটার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৯৩ জন। ফলে সবাইকে স্মার্ট কার্ড দিতে আরও প্রায় ৪ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩৫টি ব্ল্যাংক কার্ড প্রয়োজন। অবার্থারের পর দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফের কাছ থেকে কার্ড নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের চুক্তি শেষ হলে রাজস্ব খাত থেকে প্রকল্পের ব্যয় মেটানো শুরু হয় এবং ২০২০ সালে ‘আইডিইএ-২’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ডলারের দাম বাড়ায় পরবর্তীতে চুক্তির সংশোধন করে কার্ডপ্রতি মূল্য ১৩৫.৫০ টাকার পরিবর্তে ১৭২ টাকা নির্ধারণ করে ২ কোটি ৩৬ লাখ কার্ড কেনার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। বর্তমানে নতুন ভোটারদের সাধারণ কার্ড দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com