বৃহস্পতিবার, ১১ Jun ২০২৬, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিবেদক, অর্থনৈতিক ডেস্ক ॥
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক চাপের পাহাড়সম চ্যালেঞ্জকে সঙ্গী করে আজ বৃহস্পতিবার, (১১ জুন ২০২৬) নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আজ বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে তিনি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল ও রেকর্ড আকৃতির বাজেট উপস্থাপন করবেন।
দীর্ঘ ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান- দুজনেরই বাজেট ঘোষণার ক্ষেত্রে আজ অভিষেক হতে যাচ্ছে। তবে এটি বিএনপি সরকারের ১৭তম বাজেট। সংসদ ভবনের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই বাজেট অনুমোদনের পর তা সংসদে পেশ করা হবে।
এক নজরে বাজেটের আয়-ব্যয় ও ঘাটতি
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় এবার বাজেটের আকার বাড়ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা (১৮.৭৩% বৃদ্ধি), যা দেশের ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি।
মোট ব্যয় (বাজেটের আকার): ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয়: ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি): ৩ লাখ কোটি টাকা।
মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা: ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআর উৎস: ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
নন-এনবিআর উৎস: ২৫ হাজার কোটি টাকা।
এনটিআর খাত: ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (রেকর্ড)। এই ঘাটতি পূরণে বরাবরের মতো বৈদেশিক ঋণ, অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত এবং সরকারি-বেসরকারি উৎসের ওপর নির্ভর করবে সরকার।
প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য এবং বাস্তবতা
বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬.৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করলেও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী তা ৫ শতাংশের কম হতে পারে। ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরগতির শঙ্কা সত্ত্বেও নতুন নির্বাচিত সরকার এই উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়েছে। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে টানা কয়েক বছর মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের কাছাকাছি থাকা, সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম রেকর্ড বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতিবিদরা এই লক্ষ্য অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন।
১৩টি অগ্রাধিকার ও সামাজিক সুরক্ষাজাল
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা, নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন ও ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যসহ মোট ১৩টি ইস্যুকে বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও স্থানীয় সরকার খাত এখানে প্রধান।
বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতা ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি।
আগামী বছরের চিহ্নিত ৮ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ, কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে বের হওয়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ-সারে ভর্তুকি দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ জোগান, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো (বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্প), বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ রক্ষা এবং ঋণ ধারণ সক্ষমতা বৃদ্ধি।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৌশল: কর-প্রশাসনের অটোমেশন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, করের আওতা বাড়ানো, কর অব্যাহতি সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া, এডিপি বাস্তবায়নে মনিটরিং, সীমিত পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধন এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সমন্বয় করা।
করকাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন: সাধারণ মানুষ ও তরূণদের জন্য সুখবর
মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে করের হার না বাড়িয়ে কর ফাঁকি রোধ ও সম্পূর্ণ অটোমেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সাথে দেওয়া হয়েছে ব্যাপক জনমুখী ছাড়:
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও স্বাস্থ্য: চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, আলু, পিঁয়াজ-রসুনসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে কর সর্বোচ্চ ৫% থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫% করা হচ্ছে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করায় প্রতি ডায়ালাইসিসে খরচ কমবে প্রায় ৮০০ টাকা। হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ভ্যাট প্রত্যাহারে রিংয়ের দাম প্রায় ২০,০০০ টাকা এবং লেন্সের দাম প্রায় ৫,০০০ টাকা কমবে।
ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ ও মোবাইল সেবা: সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ কর ও ভ্যাটমুক্ত (১৫%) করা হচ্ছে। তারুণ্যনির্ভর স্টার্টআপের টার্নওভার ট্যাক্স ০% করার পাশাপাশি স্থানীয় ভ্যাট ও স্থান ভাড়া ভ্যাট ২০৩৫ সাল পর্যন্ত মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণ গ্রাহকদের মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ০% কর এবং বিলে ৫% রেয়াত থাকবে।
পরিবেশবান্ধব ইভি ও জ্বালানি চালিত গাড়ি: পরিবেশবান্ধব ইভি বাস, ট্রাক ও চার্জিং স্টেশন আমদানির উৎসে কর ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইভি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের অগ্রিম কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ক্যাপাসিটি অনুযায়ী ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিপরীতে পরিবেশ দূষণ রোধে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসির ডিজেল ও পেট্রোল গাড়ির সামগ্রিক করভার ১৩২.৩৬% থেকে বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮% করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।