সোমবার, ২০ Jul ২০২৬, ০৭:৩৭ অপরাহ্ন

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ কি কেবলই কাগজে-কলমে? উপেক্ষিত সাংবাদিকদের অধিকার ও সুরক্ষার দাবি

মোঃ মিরন খন্দকার ॥
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি ধরা হয় চারটি স্তম্ভকে- আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং চতুর্থটি হলো সংবাদ মাধ্যম বা গণমাধ্যম। সংবাদ মাধ্যমকে বলা হয় ‘জাতির দর্পণ’ বা সমাজের আয়না। সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিয়ম, দুর্নীতি আর সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের চিত্র যিনি বা যারা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই দর্পণে ফুটিয়ে তোলেন, তারা হলেন সাংবাদিক ও সংবাদ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে স্তম্ভটির ওপর ভর করে রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়, সেই স্তম্ভের কারিগররাই আজ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত।

পেশাগত ঝুঁকি বনাম শূন্য সুরক্ষা
রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনামূল্যে বা বিশেষ সুবিধায় যানবাহন ব্যবহারের সুযোগ পান। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে বিশেষায়িত হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবা এবং আইনি সহায়তার শক্তিশালী কাঠামো। অথচ, একজন সাংবাদিক যখন ঝড়-বৃষ্টি, মহামারি কিংবা চরম রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন, তখন তার পেছনে রাষ্ট্রের কোনো দৃশ্যমান সুরক্ষাকবচ থাকে না।

সাংবাদিকদের জন্য সাংবিধানিকভাবে বা রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা সুবিধা, আইনি সহায়তা কিংবা যাতায়াত সুবিধার (যেমন: গণপরিবহন বা বিশেষ যানে ফ্রি বা রেয়াতি যাতায়াত) বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে প্রতিনিয়ত মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বহু সাংবাদিককে হামলা, মামলা ও নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

কেন সাংবাদিকদের বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রয়োজন?
নির্ভীক ও জেনুইন সাংবাদিকতা নিশ্চিতকরণ: একজন সাংবাদিক যখন জানবেন যে তার পেছনে রাষ্ট্রীয় আইনি ও চিকিৎসা সুরক্ষা রয়েছে, তখন তিনি কোনো ভয় বা চাপের মুখে না পড়ে নির্দ্বিধায় সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে পারবেন।

পেশাগত বৈষম্য দূরীকরণ: রাষ্ট্রের অন্যান্য স্তম্ভের চালিকাশক্তিরা যদি দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ সুবিধা পেতে পারেন, তবে চতুর্থ স্তম্ভের কর্মীরা কেন মৌলিক নাগরিক ও পেশাগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন?

মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা থেকে সুরক্ষা: পেশাগত কারণে সাংবাদিকদের প্রায়ই প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়তে হয়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সাংবাদিকদের জন্য বিনামূল্যে বা সাশ্রয়ী আইনি সহায়তার সেল থাকলে তারা আইনি হয়রানি থেকে রেহাই পাবেন।

“সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা একই সুতোয় গাথা। অর্থনৈতিক ও শারীরিক নিরাপত্তা ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা অসম্ভব।”

রাষ্ট্রের প্রতি কিছু জরুরি সুপারিশ
সংবাদমাধ্যমকে প্রকৃত অর্থেই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে কার্যকর রাখতে এবং সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ নির্বিঘ্ন করতে রাষ্ট্রের জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত:

১. বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা: সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাংবাদিকদের জন্য বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।

২. আইনি সহায়তা সেল গঠন: তথ্য অধিকার আইন ও মুক্ত সাংবাদিকতা চর্চা করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক হয়রানিমূলক মামলার শিকার হলে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করা।

৩. যাতায়াত সুবিধা: পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি গণপরিবহন, টোল ও অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ রেয়াতি বা ফ্রি যাতায়াত সুবিধা প্রদান করা।

৪. ওয়েজবোর্ড ও চাকরি নিরাপত্তা: সকল সংবাদপত্রে ওয়েজবোর্ড (সংবাদপত্র মজুরি বোর্ড) বাস্তবায়ন এবং সংবাদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি ও ভাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় মনিটরিং জোরদার করা।

উপসংহার
একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল, তা পরিমাপ করা হয় সেই দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে। সাংবাদিকদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং রাষ্ট্রের নিজের স্বার্থেই এটি করা প্রয়োজন। রাষ্ট্র যখন সাংবাদিকদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসবে, তখনই সমাজ থেকে অপসাংবাদিকতা দূর হবে এবং জেনুইন ও বস্তুনিষ্ঠ খবরগুলো কোনো বাধা ছাড়াই আলোর মুখ দেখবে।

অবিলম্বে সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার, চিকিৎসা, আইনি ও লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের জন্য আমরা সাংবাদিক মহলের পক্ষে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com