শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১০ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধি ঃ একটি নাড়ু, এক টুকরো শৈশব, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা বাঙালির আত্মপরিচয়। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে অতিথি আপ্যায়নের চিরচেনা এই মিষ্টান্নকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ নবাবগঞ্জে বসেছিল ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা ও সম্প্রীতির ব্যতিক্রমী আসর। সেই উৎসবের মঞ্চ থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক দিলেন সাংস্কৃতিক জাগরণের আহ্বান। তাঁর বক্তব্য, বাংলার শেকড়ের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং মৌলবাদী অপশক্তিকে রুখতে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে দিতে হবে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসব।
শুক্রবার ৯ অক্টোবর বিকেলে নবাবগঞ্জের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘নাড়ুউৎসব ২০২৬’। ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নবাবগঞ্জ ললিতকলা একাডেমি (নাফা) এবং ইনভিশন অ্যাকশন রিওয়ার্ড অ্যাসেট (ইয়ারা)-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসব পরিণত হয় গ্রামীণ ঐতিহ্য, দেশীয় খাবার, শিল্প-সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলায়।

আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের একমাত্র নাড়ু উৎসব হিসেবে পরিচিত এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য বাংলার মাটির সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা এবং বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা। উৎসবের প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক বলেন, এটি পৃথিবীর একমাত্র নাড়ু উৎসব, যেখানে বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, শরতের শেষে গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের উৎসব বাঙালি সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত করে। মৌলবাদী অপশক্তিকে রুখতে এ ধরনের নানা উৎসব প্রতিটি পাড়া মহল্লায় ছড়িয়ে দিতে চান তিনি।
এ বক্তব্যে উৎসবের তাৎপর্য কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিস্তারের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। বাংলার লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন জোরদার করার ক্ষেত্রে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাড়ু উৎসবের প্রবর্তক, গবেষক ও সংগঠক সায়মা রহমান (তুলি) বলেন, গ্রামবাংলায় দীর্ঘকাল ধরে অতিথি আপ্যায়নে নাড়ুর ব্যবহার চলে আসছে। পরিবারের সদস্যদের হাতে তৈরি নানা স্বাদের নাড়ু শুধু খাবার নয়, আপনজনের ভালোবাসা ও নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগও তৈরি করে। তিনি বলেন, নানা ধরনের খাবারের ভিড়ে বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার যেন হারিয়ে না যায়। যাঁরা যত্ন ও সৃজনশীলতায় বিভিন্ন ধরনের নাড়ু তৈরি করেন, তাঁদের উৎসাহিত করাও এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সায়মা রহমান জানান, কয়েক বছর ধরে তিনি এ উৎসবের আয়োজন করে আসছেন। প্রতিবছরই আয়োজনের মধ্যে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য রাখার চেষ্টা করা হয়। আগামী বছর ঢাকায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নাড়ু উৎসব আয়োজনের লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
নাফার প্রতিষ্ঠাতা শফিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উদ্বোধক ছিলেন শিক্ষাবিদ ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা মাহমুদ আলী খনা (টুলু স্যার)। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষক তামান্না রহমান, রোদসী ম্যাগাজিনের সম্পাদক সাবিনা ইয়াসমিন, নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াছিন খন্দকার, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাউন্সিলর আরশীন মাহমুদ, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম খন্দকার, ফয়সাল তিতুমীর এবং নারী উদ্যোক্তা মাহমুদা কলিসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শেফ, লেখক ও শিল্পীরাও উৎসবে যোগ দেন। বিভিন্ন উদ্যোক্তা তাঁদের তৈরি বিচিত্র স্বাদের নাড়ু প্রদর্শন করেন। শিশু শিল্পীরা হাতে শরতের কাশফুল নিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেয়। নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের আয়োজন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারকে কেন্দ্র করে নবাবগঞ্জে গড়ে ওঠা এ আয়োজন স্থানীয় সংস্কৃতিচর্চার নতুন সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে। গ্রামীণ নারীদের রন্ধনশৈলী, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং দেশীয় খাবারের বৈচিত্র্যকে সামনে আনার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্যও তৈরি হতে পারে নতুন পরিচিতি ও বাজারের সুযোগ।
তবে এ সম্ভাবনাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে উৎসবের ধারাবাহিকতা, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ, ঐতিহ্যবাহী খাবারের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
নবাবগঞ্জের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত নাড়ু উৎসব সেই লক্ষ্যেই একটি সাংস্কৃতিক বার্তা দিয়েছে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও শেকড়কে ভুলে যাওয়া নয়। বরং নিজেদের ঐতিহ্যকে নতুন ভাবে তুলে ধরে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হতে পারে বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে সমৃদ্ধ করার পথ।