শনিবার, ১১ Jul ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

ভারী বর্ষণে বাড়ছে পাহাড়ধসের ঝুঁকি, ১২ জেলায় বন্যার আশঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক, একুশের কণ্ঠ:: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অন্তত ১২ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে সিলেট বিভাগের কয়েকটি জেলায় অস্থায়ী বন্যা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় কয়েকটি জেলার নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে কিছু এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।

কেন্দ্রের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে ফেনী, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু এলাকায় সাময়িক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের নিম্নাঞ্চলেও নতুন করে বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরের নদী সংলগ্ন এলাকায় আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের কিছু এলাকাও আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান ভারী বৃষ্টিপাত আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। বঙ্গোপসাগরে নতুন একটি মৌসুমি লঘুচাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় চট্টগ্রাম, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় উজানে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দেশে সর্বোচ্চ ২০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, পর্যবেক্ষণাধীন ১২৭টি নদীর পানি পরিমাপক স্টেশনের মধ্যে ৭৯টিতে পানি বেড়েছে, ৪৩টিতে কমেছে এবং পাঁচটিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে তিস্তা, কুশিয়ারা, সুরমা, সোমেশ্বরী ও ছোট ফেনী নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি সতর্কসীমায় রয়েছে।

কক্সবাজারে পাহাড়ধস আতঙ্ক, ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। জেলার অন্তত ৪০টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি রয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। ৪ জুলাই রাত থেকে ৯ জুলাই দুপুর পর্যন্ত পাহাড়ধসে ১৫ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১৮ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৬ হাজারের বেশি মানুষ। সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৪ হাজারের বেশি মানুষ।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ পর্যন্ত ২৮৬টি আবহাওয়াজনিত দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৯৫টি ভূমিধস, ১৫৬টি ঝোড়ো হাওয়া ও ২১টি বন্যার ঘটনা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো।

এদিকে কক্সবাজারে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ধসে গত চার দিনে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি

চট্টগ্রামে আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে মিরাজ (৫) ও আশিক (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসে গত কয়েক দিনে নারী-শিশুসহ অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে।

লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় প্রায় ৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

মৌলভীবাজারে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত গ্রাম

মৌলভীবাজারের রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রাজনগরের টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর এলাকায় মনু নদের বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে।

ভাঙনের কারণে হরিপাশা, উজিরপুর, কান্দিরকুল ও একামধু ভাঙ্গারহাটসহ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ২০০ ফুট ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করায় এলাকার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে এবং পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com