বুধবার, ২২ Jul ২০২৬, ০২:১৮ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনছে, আগস্টে চুক্তি

অনলাইন ডেস্ক, একুশের কণ্ঠ:: জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়নে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি করবে সরকার। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ২০৩১ সাল থেকে ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ বিমান বাংলাদেশের বহরে যুক্ত হবে।

এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের মতো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পূর্ণাঙ্গ মিশ্র বহর বা ‘মিক্সড ফ্লিট’ নিয়ে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ বিশ্বের দুই শীর্ষ উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং এবং ইউরোপের এয়ারবাসের উড়োজাহাজ একই সঙ্গে পরিচালনা করবে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, আমরা ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করব। দাম, অর্থায়ন পদ্ধতি এবং অন্যান্য শর্তসহ কেনাকাটার বিস্তারিত তথ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রকাশ করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের জাতীয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে শুধু প্রাথমিক মূল্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, কারিগরি সহায়তা এবং যাত্রীসেবার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাতে উড়োজাহাজ সংগ্রহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিযোগিতায় রয়েছে বিশ্বের দুই বৃহৎ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং ও এয়ারবাস। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।

বোয়িংয়ের প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ উড়োজাহাজ কেনার বিষয় রয়েছে। বোয়িংয়ের সঙ্গে এই চুক্তির সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশে এয়ারবাসের তৎপরতা বাড়ে। দীর্ঘ আলোচনার পর এয়ারবাসের পক্ষ থেকে বিমানের কারিগরি ও অর্থনৈতিক কমিটির কাছে ১০টি উড়োজাহাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবে ছিল চারটি এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ ওয়াইড বডি উড়োজাহাজ এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারো বডি উড়োজাহাজ।

এয়ারবাসের প্রস্তাবের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড ডেলাহায়ে সম্প্রতি ঢাকায় এসে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই বৈঠকে উড়োজাহাজের মডেল, কারিগরি সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ বহর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত বলেন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর সরকার এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, বিমানকে মিশ্র বহরের এয়ারলাইন্সে রূপান্তর করার একটি সমন্বিত সরকারি নীতির অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এয়ারবাসের ১০টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বহরের আকার বেড়ে দাঁড়াবে ২৯টিতে। এটি বর্তমান বহরের তুলনায় প্রায় ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে ভবিষ্যতে বিমানের বহর সম্প্রসারণের পরিধি আরও বাড়বে।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমান বাংলাদেশের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিকায়ন, নতুন আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক যাত্রী ও কার্গো বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ এর আগেও নেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এয়ারবাসের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হলেও তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তখন প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। পরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ওই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।

বর্তমান সরকার জানিয়েছে, এবার সব ধরনের যাচাই-বাছাই শেষে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তি সম্পন্ন করা হবে এবং রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বিমান খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ নিয়ে মিশ্র বহর পরিচালনার মাধ্যমে বিমান পরিচালন সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনায় প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনা এবং কারিগরি খরচও বাড়তে পারে।

তাদের মতে, বড় ধরনের উড়োজাহাজ ক্রয় শুধু উড়োজাহাজের দাম দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। এর সঙ্গে ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ, পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী মাসে চুক্তি স্বাক্ষরের পর উড়োজাহাজ উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হবে। ২০৩১ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে নতুন এয়ারবাস উড়োজাহাজগুলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হবে।

অ্যাভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, থার্ড টার্মিনাল চালুর প্রেক্ষাপটে নতুন উড়োজাহাজ সংযোজন দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com