মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩০ অপরাহ্ন
পঞ্চগড় প্রতিনিধি:: একসময় অগ্রহায়ন মাসের শুরুতে আমন ধান কাটা শুরু হলেও এখন কার্তিক মাসের শুরুতেই মাঠে পাকতে শুরু করেছে আগাম জাতের আমন ধান। পঞ্চগড়সহ উত্তরের বিভিন্ন জেলায় আগাম আমনের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। কিন্তু আগাম জাতের আমন ধান চাষ এবং ধান কাটার পর জমিতে আগাম শীতকালীন শাকসবজি আবাদের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগও বেড়েছে।
উঁচু জমিতে চাষ করা আগাম জাতের আমন ধান ইতোমধ্যে পাকতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ধান কেটে বাড়িতে তোলাও শুরু হয়েছে। নতুন ধানের গন্ধে কৃষকের বাড়িতে বইছে আনন্দের সুবাস। অনেক বাড়িতে চলছে নতুন ধানের চাল দিয়ে পিঠা-পুলি তৈরির আয়োজন। অন্যদিকে যেসব জমির ধান এখনো পাকেনি, সেসব এলাকার কৃষকেরা ধান ওঠার অপেক্ষায় দিন পার করছেন। ধান কাটার পাশাপাশি কাঁচা খড় বিক্রি করেও বাড়তি আয় করছেন কৃষকেরা। গো-খাদ্যের চাহিদা থাকায় ধানের কাঁচা খড়ের বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষকেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা প্রকৃতিনির্ভর আমন ধান চাষ করে আসছেন। আগে অগ্রহায়ন মাসের শুরুতে ধান কাটা শুরু হলেও এখন আগাম জাতের ধানের কারণে এক থেকে দেড় মাস আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার আমনের ফলনও ভালো হয়েছে। এবার মাঠে ব্রি ধান-৩৩, ৫৬, ৬২ ও ৭২, বিনা-৭সহ বিভিন্ন আগাম জাতের ধানের পাশাপাশি ভারতীয় জাতের গুটি পারি ও স্বর্ণা পারি ধান চাষ হয়েছে। কৃষকদের দাবি, পুরোনো জাতের আমন ধানে যেখানে বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ মণ ফলন পাওয়া যেত, সেখানে আগাম জাতের ধানে ১৫ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাচ্ছে। শুরুতে নতুন ধানের দাম কিছুটা কম হলেও কাঁচা খড় বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন তাঁরা। এক বিঘা জমির ধান কেটে মাড়াইয়ের পর কাঁচা খড়ের আঁটি বাজারে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। অনেক কৃষক ধান কাটার পর দ্রুত জমি চাষ দিয়ে শুকিয়ে নিচ্ছেন। কিছুদিনের মধ্যেই এসব জমিতে আগাম জাতের আলু, সরিষা, গমসহ বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। এতে একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বোদা সদর ইউনিয়নের কান্তমনি গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, এবার তিনি দুই বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর জমির সব ধান পেকে গেছে। ধানের অবস্থা ভালো হওয়ায় বিঘাপ্রতি ১৯ থেকে ২০ মণ ফলনের আশা করছেন তিনি। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে ধান কাটবেন। তিনি বলেন, বর্ষার শেষ দিকে ধানক্ষেতে পোকামাকড়ের আক্রমণে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছিল। এ জন্য জমিতে অনেক টাকা খরচ করে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়েছে। আগের তুলনায় উৎপাদন খরচও অনেক বেড়েছে। ময়দানদিঘী বাজারে নতুন ধান প্রতি মণ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা হলে কৃষকেরা ভালোভাবে লাভবান হতে পারতেন।
তিনি আরও বলেন, দুই বিঘা জমির ধান কাটার পর সেখানে আলু ও বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করবেন। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
এ বিষয়ে পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন বলেন, চলতি আমন মৌসুমে পঞ্চগড় জেলায় ১ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ জেলায় ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ধান উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন কাঁচা ধান বাজারে আসতে শুরু করায় বর্তমানে দাম কিছুটা কম। পুরো মৌসুমে ধান কাটা শুরু হলে এবং মিলাররা ধান কেনা শুরু করলে দাম আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।