রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন
আমিরুল ইসলাম ॥
‘ওই মিয়া, সামনে খাড়াইলেন ক্যান? বাইক আগায়া লন, আমি যামু গা। আপনার সিগনাল পড়ছে, আপনি থাকেন, আমার পথ ছাড়েন।’ রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকা এক মোটরসাইকেল আরোহীকে এভাবেই ধমক দিচ্ছিলেন পেছনে থাকা একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক।
রবিবার ১৭ মে রাত ১১টার দিকে বাংলামোটর মোড়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। ইস্কাটনের দিক থেকে আসা যানবাহনগুলো ট্রাফিক সিগনাল মেনে নির্ধারিত দাগের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু পেছনে আটকে থাকা ব্যাটারিচালিত রিকশার যুবক চালক বারবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মোটরসাইকেল আরোহী সিগনাল না ছাড়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে সেখানে বাগবিতন্ডার সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলে থাকা অন্যান্য মোটরযান চালক ও আরোহীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের যানবাহনের জন্য সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হয়। ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা হয়, এমনকি এখন এআই ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় মামলা হচ্ছে। অথচ ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইকগুলো কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। তারা ট্রাফিক সিগনাল মানে না, উল্টো সংঘবদ্ধ হয়ে হুমকি-ধমকি দেয়। পুলিশও অনেক ক্ষেত্রে অসহায়।”
রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা এখন এতটাই বেড়ে গেছে যে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই, চালকদের লাইসেন্স নেই, এমনকি কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষও নেই। ফলে টাকা থাকলেই যে কেউ একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইক কিনে রাস্তায় নামতে পারছেন। তাদের ভাষায়, “এখন রাজধানীতে কত ব্যাটারিচালিত যান চলছে তার সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। অগণিত ব্যাটারিচালিত বাহনে ছেয়ে গেছে পুরো শহর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রধান সড়কগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ট্রাফিক আইন ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয় মামলা হচ্ছে। ফলে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা অনেকটাই সতর্ক হয়ে সিগনাল মেনে চলছেন। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইকগুলো এসব নিয়মের বাইরে থেকেই চলাচল করছে। সুযোগ পেলেই তারা উল্টো পথে ঢুকে পড়ছে, চলন্ত যানবাহনের ফাঁক গলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ছুটে যাচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে রাজধানীর অভ্যন্তরীণ সড়ক, সরু রাস্তা ও গলিপথ গুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
কোথাও কোথাও যেন ব্যাটারিচালিত যানবাহনের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়েছে। ট্রাফিক সিগনাল বা পুলিশের উপস্থিতি না থাকলে সেখানে নিয়ম ভাঙাই যেন স্বাভাবিক ঘটনা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী ভুক্তভোগীরা বলছেন, শুধু বাস, প্রাইভেটকার বা মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ করলেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না। দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যাটারিচালিত যানবাহনকেও একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থা আরও অচল হয়ে পড়বে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, “রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে ট্রাফিক পুলিশ ও এআই প্রযুক্তি নির্ভর সিগনাল ব্যবস্থা কার্যকর করার মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে কিছু সুফলও মিলেছে। তবে প্রধান সড়কের বাইরের রাস্তাগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের যানবাহনকে নিয়ম-নীতির মধ্যে আনতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু পুলিশের পক্ষে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।”
রাজধানীর সড়কে দিন দিন বাড়তে থাকা ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এখন শুধু যানজটের কারণ নয়, বরং তা হয়ে উঠছে নগর জীবনের বড় এক নিরাপত্তা ঝুঁকি। নিয়ন্ত্রণহীন এ পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।