মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:২৬ পূর্বাহ্ন
মোহাম্মদ আলম॥ বাংলাদেশ নির্বাচনের উৎসবে মেতেছে। ব্যতিক্রম প্রচারণা এবং প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়িতে জমে উঠেছে নির্বাচন। বরাবরের মতই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ঢাকা-১ সংসদীয় আসন। রাজনৈতিক ইতিহাস, ভোটের সমীকরণ আর প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সবমিলিয়ে এবারো এই আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৪৫ হাজার ১৪০ জন। কে হচ্ছেন ঢাকা-১ আসনের এমপি। মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপি’র সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক। তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম।
এ ছাড়া, স্বতন্ত্র প্রাথী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার জেষ্ঠ্য কন্যা এডভোকেট অন্তরা হুদা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী নুরুল ইসলাম। কাগজ-কলমে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নাসিরউদ্দিন মোল্লা ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির শেখ মোহাম্মদ আলী থাকলেও মাঠে তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে কম। ব্যতিক্রম প্রচারণা এবং সুষ্ঠু পরিবেশের কারণে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত প্রচার প্রচারণায় সমান তালে থাকলেও ভোটের ফলাফলে নিরব বিপ্লবের আভাস পাওয়া গেছে।
বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আবু আশফাক বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে। তবে প্রতিদ্বন্দী দল নির্বাচনে কারচুপির পাঁয়তারা করছে। ভুয়া ব্যালট পেপার ছেপে জাল ভোটের আশংকা আছে। এছাড়া ভয়ভিতি দেখিয়ে হিন্দু ও খ্রীস্টান ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে সব বাধা উপেক্ষা করে সাধারণ ভোটার তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে বলে তিনি আশাবাদি। তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, আসন্ন নির্বাচনে জনগণ তাকে নিরাশ করবেন না। ভোটের ফলাফল তার পক্ষেই আসবে। তিনি বলেন, দোাহার-নবাবগঞ্জে গ্যাস সংযোগ দিয়ে শিল্পাঞ্চলে রূপান্তর, মাদকমুক্ত যুব সমাজ, আধুনিক হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়সহ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে জোড় দিবেন।
অপরদিকে, জামায়াত প্রার্থী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম বলেন, দোহার ও নবাবগঞ্জ রাজধানী ঢাকার পাশের উপজেলা হওয়া সত্ত্বেও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত অবস্থার কারণে এখানকার মানুষ বহু সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এ সমস্যার সমাধানে তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছেন, মেট্রোরেল মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন দোহার-নবাবগঞ্জকে মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে। তিনি দাবি করেন, দোহার-নবাবগঞ্জে কাউকে অন্যায় ও অবিচার করতে দেওয়া হবে না। ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতেই এই দুই উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম বিজয়ের আশাবাদ জানিয়ে আরও বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে সব শ্রেনি পেশার মানুষের নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন। এই দুই উপজেলার সিংহভাগ মানুষের পেশা ছিল তাঁত এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের পেশা ছিল মাছ শিকার। কালের বিবর্তনে এসব পেশা আজ বিলুপ্তির পথে। ফলে এসব পেশাজীবী পরিবার নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তিনি বলেন, এসব ঐতিহ্যবাহী পেশা বাঁচাতে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনে এসব পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থাও করা হবে। এছাড়া গ্যাস, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও উন্নত প্রশিক্ষণ, তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিগতভাবে যুগোপযুগি করে গড়ে তুলায় তিনি জোড় দিবেন।
বিএনপি’র প্রার্থী খন্দকার আবু আশফাক পুরো এলাকায় উঠান বৈঠক, গণসংযোগ আর নানা প্রতিশ্রুতিতে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। মনোনয়ন পাওয়ার পর প্রচারণার শুরুতে দলের ভেতরে কিছু অসন্তোষ থাকলেও পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। প্রয়াত আব্দুল মান্নানের কন্যা মেহনাজ মান্নান এখন প্রকাশ্যে আবু আশফাকের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। দলীয় কোন্দল কাটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটের ফলাফল পক্ষে আনতে পারলে বিএনপি’র বিজয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না ভোটাররা। এদিকে, প্রচারণায় পিছিয়ে নেই জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম। ভোরে নির্বাচনী এলাকার কোন মসজিদে ফজরের নামাজের মাধ্যমে দিন শুরু করেন তিনি। গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তুলে ধরছেন ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন।
এনসিপি’র সঙ্গে জোট হওয়ায় তরুণ ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে বলেও দাবি করছেন তার সমর্থকরা। দোহার পৌরসভা বিএনপি’র সাবেক সহ-সভাপতি ও পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মো. ফরহাদ হোসেনসহ তার বেশ কিছু সমর্থক জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছে। একইভাবে জয়কৃষপুর ও নয়নশ্রী ইউনিয়নে শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী জামায়াতে যোগদান করেছে। জানা গেছে, দীর্ঘদিন বিএনপি’র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও দলীয় কর্মকান্ড ও আদর্শগত কারণে তারা জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। তার এই যোগদানে স্থানীয় রাজনৈতিতে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে ইতিবাচক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা-১ আসনে জাতীয় নির্বাচন আর মাত্র একদিন বাকি স্পষ্ট হচ্ছে ভোটের জটিল সমীকরণ। ঐতিহাসিক ভাবে বিএনপি’র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার একক আধিপত্যের বদলে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দীতার আভাস মিলছে। মূলত লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা হুদা বাবার রাজনৈতিক পরিচিতি ও ব্যক্তিগত যোগাযোগকে পুঁজি করে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার অতীত জনপ্রিয়তা এখনো দোহার ও নবাবগঞ্জের কিছু এলাকায় প্রভাব রাখছে। সতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা হুদার ঝুলিতে যাই যাবে তা ধানের শীষের ভোট বলে মনে করা হচ্ছে। সুশিল সমাজের প্রতিনিধি ও সাধারণ ভোটারদের ভাষ্যমতে, ঢাকা ১ এ জয় পরাজয়ে কয়েকটি বিষয় ফ্যাক্টর হিসাবে প্রভাব ফেলবে।
সারাদেশের মত এখানেও বিএনপির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীর প্রচারণায় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ ভোটারের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। যা ভোটেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া তাঁত শিল্পে সমৃদ্ধ দোহার নবাবগঞ্জে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দী জামায়াত প্রার্থী জন্মগতভাবে তাঁতির সন্তান হওয়ায় ভোটের বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে এলাকাবাসী মনে করছে। দেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা ও ভোটের সব সমিকরণে একথা বলাই যায় ঢাকা ১ সংসদীয় আসনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মাধ্যমে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হচ্ছে।