শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৬ অপরাহ্ন

‘ছবিটা শেষ পর্যন্ত চমক সৃষ্টি করলো’

বিনোদন ডেস্ক: বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি মহানায়ক উত্তম কুমার অনন্য অভিনয় জাদুতে মুগ্ধতা বিলিয়েছেন দুর্নিবার। তার অভিনীত ছবি মানেই ভালোলাগার এক বিশাল প্রাপ্তি। পর্দায় এ নায়ক যেমন উজ্জ্বল তেমনই তার ব্যক্তিজীবনের চলাচলেও ছিল নানান রঙের মিশেল। সেই অজানা জীবনের গল্প তার বয়ান থেকে অনুলিখন করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ যা পরবর্তী সময়ে ‘আমার আমি’ নামে বই আকারে প্রকাশ হয়। সে বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে উত্তম কুমারের আত্মজীবনী-

আমি মাথা নিচু করে খেতাম ওদের পাশে বসে। সেইভাবেই হয়তো মুখ বুঝে সব সহ্য করতে পারতাম যদি আমার ক্ষেত্রেও সেই রীতি চালু থাকত আজও।
কিন্তু চালু থাকল না। দেখলাম, আমি যেন রাতারাতি জাতে উঠে গেছি। আমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। আমার জন্য স্পেশাল খাদ্য।
ঠিক সেই মুহূর্তে অনিলের কথা মনে পড়ছে। অনিল চ্যাটার্জি।
অনিল আমার বন্ধু। আমার প্রথম দিনের বন্ধু। চকচকে ছেলে। সাদা হাস্যময়। সে তখনও সিনেমার অভিনেতা হয়নি। আমি তখন মোটামুটি কাজ করে চলেছি। আমাদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব অম্লান। আমরা অনেকটা সময় একসঙ্গে কাটাতাম। খেলতাম। পাড়ার নানা পুজো-পার্বণ নিয়ে মেতে থাকতাম। হঠাৎ শুনলাম অনিল সিনেমা লাইনে এসেছে।
আমি জানি বড় উঁচু আশা নিয়ে সে এসেছিল এখানে। আশা ছিল অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হবে। তারপর ভালো করে কাজ শিখে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডিরেক্টর হবে। তারপর আরও বড় হবে। বিরাট এক শিল্পীমন ছিল তার। অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিসেবেও কাজও পেয়েছিল সে। মাঝে মধ্যে আবার সিনেমার পর্দায় অভিনয়ও করত।
ঠিক এমন সময় কী যেন একটা ছবিতে আমি অভিনয করছি, আর সেই ছবিতে আমার সঙ্গে অনিলও অভিনয় করছে। শুটিং-এর লাঞ্চব্রেকের সময় আমি অনিলকে ডাকলাম। বললাম, চলো আজ আমরা একসঙ্গে খেতে বসব।
অনিলের কেমন যেন সংকোচ। তবুও বোধকরি আমার অনুরোধ সে এড়াতে পারল না। আমরা যথাস্থানে খেতে বসলাম। খাবার এল। আমার খাবার প্লেটে সাজানো আর অনিলের সামনে শালপাতায় অতি সাধারণ খাবার। মুহূর্তে আমার শিরা-উপশিরাগুলো যেন টনটন করে উঠল। আমার ভিতরকার মানুষটা রাগে আর উত্তেজনায় যেন ফুঁসে উঠল। আমি চিৎকার করে উঠতে চাইলাম। অনিল ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমাকে সংযত করার চেষ্টা করল। আমি নীরবে আমার প্লেটটা সরিয়ে রাখলাম।
মুহূর্তে কথাটা সারা স্টুডিওতে রটে গেল। প্রোডিউসার তাড়াতাড়ি ছুটে এলেন! আমি রীতিমতো উত্তেজিতভাবেই তাকে বললামÑ সবাইকে যদি সমান সম্মান দিতে না পারেন তাহলে এ খাবার আমি খাব না, আর কোনোদিন এভাবে আমার জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা করে এদের অপমান করবার চেষ্টা করবেন না।
উপস্থিত সকলেই তখন আমার কথাকে মেনে নিলেন এবং সব কিছুরই নতুন রূপ দেখা দিল। এরপর থেকে আস্তে আস্তে সেই প্রথার অবসান হলো। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।
এই ১৯৫৫ সালেই যখন সুস্থ হয়ে আবার স্টারে যোগ দিলাম, তখন একদিন অভিনয় চলাকালীন আমি স্টেজেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। খবর পেয়ে বাড়ির সবাই যখন স্টারে এসে পৌঁছেছিল তখন অবশ্য আমি আবার সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম। অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্যই বোধকরি এমনটা হয়েছিল।
যাহোক, এই বছরে পর-পর বারোটা ছবি মুক্তি পেল। সব ছবিই সার্থকতার সোপান পেরুতে পারল না। তবে তার মধ্যে কয়েকটি ছবির অনন্যসাধারণ জনপ্রিয়তা আমার অভিনেতা জীবনকে যেন আরও পরিণতির পথে এগিয়ে নিয়ে গেল।
মুক্তি পেল ‘হ্রদ’। অর্ধেন্দু সেনের পরিচালনাধীন এই ছবিতে একজন স্মৃতিভ্রষ্ট যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি সেই দুরূহ চরিত্রটি যখন পরিচালক আমাকে শুনিয়েছিলেন তখন বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা আমাতে ভর করেনি। ছবিটার আগাগোড়া সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট। চরিত্রটিকে বাস্তবায়িত করার কোনো ত্রুটিই আমার ছিল না। তা ছাড়া সন্ধ্যারানীর আন্তরিক দরদভরা অভিনয়ের সহযোগিতায় ছবিটা শেষ পর্যন্ত চমক সৃষ্টি করলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com