রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৫ অপরাহ্ন
মাঈন উদ্দিন, খালিয়াজুরী (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি:: মাদক শুধু একজন মানুষের জীবনই ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে একটি পরিবার, সমাজ ও একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার পুরো লেপসিয়া গ্রামে সামাজিকভাবে মাদকবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে লেপসিয়া গ্রামের আশপাশে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার সময় উজ্জ্বল মিয়া (২০) নামে এক যুবককে আটক করেন স্থানীয় মাদকবিরোধী কমিটির কয়েকজন সদস্য। পরে তার কাছ থেকে ৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
আটকের পর বিষয়টি লেপসিয়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রকে জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে। উজ্জ্বল মিয়া লেপসিয়া লংকা এলাকার কাজল মিয়ার ছেলে। তার মায়ের নাম রাজিয়া আক্তার।
স্থানীয়রা জানান, মাদক প্রতিরোধে লেপসিয়া গ্রামে সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, তরুণদের মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা এবং মাদকসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন।
লেপসিয়া গ্রামের বাসিন্দা জামাল মিয়া বলেন, মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। মাদকসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো জরুরি।
লেপসিয়া পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা আলকাছ মিয়া বলেন, গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে কয়েকজন মাদক কারবারি রয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে। তাই গ্রামের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কেউ মাদক ব্যবসা বা সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সম্মিলিতভাবে পুলিশকে জানানো হবে।
লেপসিয়া গ্রামের জাকির বলেন, মাদকের ব্যাপারে সবাইকে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। উক্ত গ্রামের শামিম আহমেদ বলেন, মাদক সেবনকারী ও মাদক ব্যবসায়ীর কোন ছাড় পাবে না, এদের রুখতে সবাইকে একত্রিত থাকতে হবে।
লেপসিয়া দক্ষিণপাড়ার মো. কামাল আজিম বলেন, মাদক প্রতিরোধে প্রতিটি গ্রামের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কেউ মাদক বিক্রি বা সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকলে পুলিশকে জানানো হবে। পাশাপাশি বাইরে থেকে যাতে গ্রামে মাদক প্রবেশ করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা হবে।
ছমিরপুর গ্রামের সমাজসেবক ও ২ নম্বর চাকুয়া ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার আবুল সালেক বলেন, চাকুয়া ইউনিয়নের ফতুয়া, রানীচাপুর, হারারকান্দি ও লেপসিয়া গ্রামে মাদকের বিস্তার নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে লেপসিয়াবাসীকে নিয়ে মাদক প্রতিরোধে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাদক বিক্রি ও সেবন দুটিকেই গুরুতর সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লেপসিয়া পশ্চিমপাড়ার তরুণ নাজরুল ইসলাম বলেন, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরা সমাজের কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজনকে সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে এবং কখন বাড়ি ফিরছে, অভিভাবকদের সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
লেপসিয়া চেয়ারম্যানপাড়ার তরুণ মনির হোসেন বলেন, গাঁজা ও ইয়াবার মতো মাদক ও ক্ষতিকর আসক্তি প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একই মত প্রকাশ করেন লেপসিয়া দক্ষিণপাড়ার যুবক সজিব আজিম। তিনি বলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে মাদক দমন করা সম্ভব।
লেপসিয়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই ওয়াদুদ বলেন, মাদকের ভয়াবহতা থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার ও পুরো সমাজকে ধ্বংস করে। মাদক নির্মূলে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসিরুদ্দিন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুরো লেপসিয়া গ্রামবাসীর উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। হাওরাঞ্চলের অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শুধু পুলিশের একার পক্ষে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, খালিয়াজুরী থানার আওতাধীন কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি বা সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রামবাসী কোনো তথ্য পেলে নিজেরা আইন হাতে না তুলে পুলিশকে জানালে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।