সোমবার, ২০ Jul ২০২৬, ০৭:৪৩ অপরাহ্ন

উজানের ঢল ও লঘুচাপে কাঁপছে দেশ: উত্তরে বন্যার শঙ্কা, দক্ষিণে জোয়ারের থাবা

ডেস্ক রিপোর্ট ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি ॥
ঢাকা/রংপুর/বরিশাল/রাঙামাটি: দেশের আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতি একযোগে অবনতির দিকে যাচ্ছে। ভারতের উজানে ভারী বর্ষণ এবং বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তীব্র তারতম্যের কারণে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় বন্যা ও প্লাবনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী সোমবারের (২০ জুলাই ২০২৬) মধ্যে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)।

এরই মধ্যে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্য বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রংপুর বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

উত্তরের নদীগুলো ফুঁসছে, জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, আগামী দুই দিনে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি বাড়লেও তা এখনও বিপৎসীমার নিচে অবস্থান করছে। আগামী পাঁচ দিনে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদনদীর পানি বাড়লেও সেগুলোর বিপৎসীমা পার হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আঞ্চলিক পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ের চিত্র তুলে ধরেছেন:

কুড়িগ্রাম: জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জেলার কোনো নদীর পানি এখনও বিপৎসীমা ছোঁয়েনি। তবে আসামে ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি আরও বাড়বে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমা পার হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় বড় বন্যার আশঙ্কা নেই, তবে কিছু তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

গাইবান্ধা: জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, জেলার সব নদীর পানিই ঊর্ধ্বমুখী। তিস্তার পানি বিপৎসীমা পার করতে পারে এবং আগামী দুই-তিন দিনে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটার চরাঞ্চলে বন্যা হওয়ায় এবারও আগাম প্রস্তুতি হিসেবে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রংপুর: রংপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, উজানের বৃষ্টির কারণে রংপুর ও কুড়িগ্রামে তিস্তার পানি আরও বেড়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা তৈরি করতে পারে।

দেশের অন্যান্য প্রান্তের বন্যা ও নদী পরিস্থিতি
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও অন্যান্য অংশেও নদনদীর পানি সমানে বাড়ছে:

সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকা: কুশিয়ারা নদী ইতোমধ্যে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদী ছাতক পয়েন্টে এবং কুশিয়ারা নদী মৌলভীবাজারের শেরপুর পয়েন্টে সতর্কসীমার কাছাকাছি রয়েছে, যা আগামী তিন দিনে আরও বাড়তে পারে।

নেত্রকোনা: কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে।

অন্যান্য নদী: আত্রাই, করতোয়া, ছোট যমুনা ও যমুনেশ্বরী নদীর পানি কিছুটা কমলেও নওগাঁর কয়েকটি পয়েন্টে আত্রাই ও ছোট যমুনা এখনও সতর্কসীমায় রয়েছে। জামালপুর ও বগুড়ায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি সতর্কসীমার কাছে পৌঁছাতে পারে। ঢাকার ধলেশ্বরীর পানি কিছুটা বাড়লেও বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও টঙ্গী খালের পানি স্থিতিশীল রয়েছে।

দক্ষিণে লঘুচাপের জলোচ্ছ্বাস, কাপ্তাই হ্রদের গেট উন্মুক্ত
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা চার দিন ধরে বরিশাল বিভাগের কীর্তনখোলা, তেঁতুলিয়া, মেঘনা, বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। বরিশাল পাউবোর সহকারী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম জানান, ইতিহাসে এবারই প্রথম একসঙ্গে এতগুলো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল ও ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে-পন্টুন তলিয়ে যাওয়ায় চরম ঝুঁকিতে রয়েছে নৌযাত্রীরা।

এদিকে, অনবরত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোয় গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, পানি ছাড়ার আগে হ্রদের পানির উচ্চতা ছিল ১০৪.০৯ ফুট (এমএসএল), যেখানে বিপৎসীমা ১০৮ ফুট। বর্তমানে গেটগুলো দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিট দিয়ে আরও ৩২ হাজার কিউসেকসহ মোট ৪১ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশন করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com