মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ অপরাহ্ন
জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি।। লালমনিরহাটের আদিতমারীতে গৃহবধূ আমেনা বেগমকে নির্যাতন ও যৌনাঙ্গে এসিড নিক্ষেপের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা সড়ক অবরোধ করলে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লালমনিরহাট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে খাতাপাড়া বাজার এলাকার বাসিন্দাদের উদ্যোগে এই কর্মসূচি পালিত হয়। এতে নিহত আমেনার স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মহাসড়কে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ
বিক্ষোভ চলাকালে বেশ কয়েকজন প্রতিবাদকারী হঠাৎ সড়কের ওপর শুয়ে পড়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। এতে ওই সড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় এবং যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভকারীরা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থেকে আমেনা বেগম মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। এই হত্যা মামলার আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
পরে ডিবির ওসি রওশন কবিরসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জোরালো আশ্বাস দেন। পুলিশের আশ্বাসের পর আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর আদিতমারীর বড় কমলাবাড়ী এলাকার আফজাল হোসেনের সঙ্গে আমেনা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় স্বর্ণালংকার ও কাপড়চোপড়ের পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বাকি আড়াই লাখ টাকার জন্য আমেনার ওপর নিয়মিত নির্যাতন চালানো হতো।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৭ সালের ২ মার্চ রাতে যৌতুকের বাকি টাকার জন্য স্বামী আফজাল হোসেন আমেনার পরনের কাপড় তুলে তাঁর যৌনাঙ্গে এসিড নিক্ষেপ করেন। এ সময় পরিবারের অন্যান্য আসামিরাও তাঁকে মারধর করেন। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয়ভাবে ও পরে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাধীন রাখা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২১ আগস্ট সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই মোড়া জাকির হোসেন আদিতমারী থানায় পাঁচজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন, আফজাল হোসেন, তাঁর বাবা মুসা মিয়া, মা আছিয়া বেগম, ভাই আনোয়ারুল হক ও মাহফুজা খাতুন। এর আগে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা বিচারাধীন ছিল। আমেনার মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।
আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
মামলার রিমান্ড ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে বাদীপক্ষ এবং আদালত-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। বাদী মো. জাকির হোসেনের অভিযোগ, আসামিরা প্রভাব খাটিয়ে এবং জজকোর্ট থেকে যোগসাজশে জামিন নিয়েছেন।
এছাড়া মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে অনিয়ম, আসামিকে জামিনে সহযোগিতা এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কে এম হুমায়ুন রেজা স্বপনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বাদী। পাশাপাশি তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে পিপি অ্যাডভোকেট কে এম হুমায়ুন রেজা স্বপন তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নারী ও শিশু আদালত আমার নয়, এবং আসামিপক্ষ জজকোর্ট থেকে আইনগতভাবে জামিন নিয়েছে। এ বিষয়ে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।