মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত একুশের কণ্ঠ প্রতিবেদন:: স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশে নিরক্ষরতা দূরীকরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। তিন বছর ধরেই দেশে সাক্ষরতার হার শূন্যের কোটায় ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, পাঁচ বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে এখনো দেশের ২১ দশমিক ৯ শতাংশ বা প্রায় চার কোটি মানুষ নিরক্ষর। অর্থাৎ তারা পড়তে-লিখতে পারেন না।
সেই সুবাধে আজ মঙ্গলবার বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে-‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। এ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন।
সাক্ষরতার দিবস উপলক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসাবে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে সোমবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে এখনো একটি বড় অংশ শিক্ষার মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার সুযোগ থেকে বাইরে রয়ে গেছে। ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির ছিল। ২০২১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ২০২২ সালে ছিল ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা বছর সাক্ষরতা নিয়ে ধারাবাহিক কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে দিবস এলে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, ক্রোড়পত্র প্রকাশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়। এসব কর্মসূচি সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও নিরক্ষরতা দূর করার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
জানা গেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত জনবল রয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ এর জুন পর্যন্ত বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের সাক্ষরতার জন্য মাত্র একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ছিল মাত্র ৬ হাজার ৮০৫ জন। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত প্রাক-বৃত্তিমূলক বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় ছিল মাত্র ৪ হাজার ১৯৮ জন। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বর্তমানে পর্যাপ্ত প্রকল্প ও কার্যক্রম না থাকায় মাঠপর্যায়ে ব্যুরোর কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ কার্যত নিষ্ক্রিয় সময় পার করছেন।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৭ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এবং ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং নিরক্ষরতা দূর করার অঙ্গীকার রয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ধারাবাহিক ও কার্যকর কর্মসূচির ঘাটতি। নিরক্ষর ও বিদ্যালয়বহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের জন্য নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে না। পাশাপাশি দারিদ্র্য, ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহও নিরক্ষরতা কমানোর পথে বড় বাধা। শুধু আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নিলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। সাক্ষরতা কার্যক্রমকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি এবং শিক্ষা ও কর্মদক্ষতার সঙ্গে সাক্ষরতাকে যুক্ত করতে হবে। তা না হলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সাক্ষরতার আওতায় আনা এবং নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিচালক (পরিকল্পনা, মনিটরিং ও মূল্যায়ন) ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, আমরা নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞান ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে তৈরি করার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে শিশুদের শতভাগ সাক্ষরতার মধ্যে নিয়ে আসার কার্যক্রম চলছে। বয়স্কদের একটা বড় অংশ এই কার্যক্রমে আনা যাচ্ছে না। তবে ধাপে ধাপে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি হবে।