শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০১:৫৫ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, একুশের কণ্ঠ:: সারা দেশ বর্তমানে হামের এক ভয়াবহ মহামারির কবলে। চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি সময়ে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৩ জনে। একই সময়ে সারা দেশে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১২ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ছয় শিশু হামের উপসর্গে এবং একটি শিশু সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এদের মধ্যে তিনজন সিলেট বিভাগের, দুজন ঢাকার, একজন খুলনা বিভাগের এবং একজন বরিশাল বিভাগের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৫৪ দিনে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ২৮৫ জন শিশু এবং হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে আরও ৫৮ জনের।
একই সময়ে সারা দেশে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১২ জনে। এর মধ্যে ৯৫০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ৯১৪ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ২৮২ জন শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে সর্বাধিক ২০৪ জন ঢাকা বিভাগে এবং ৪৬ জন চট্টগ্রাম বিভাগে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এর পাশাপাশি সম্ভাব্য ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুতের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
শিশু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাম সাধারণত একটি ভাইরাসজনিত ও ছোঁয়াচে রোগ, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, শ্বাসকষ্ট, বুক দেবে যাওয়া, খিঁচুনি, নিস্তেজভাব, বারবার বমি বা তীব্র পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক জানান, জ্বরের পর র্যাশ দেখা দিলে সাধারণত হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না, তবে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি, কারণ অনেক সময় পরবর্তীতে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ টিকাদান কাভারেজ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে অগ্রগতি অর্জন করলেও সাম্প্রতিক সময়ে হাম পরিস্থিতির অবনতিকে কেন্দ্র করে টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকের মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টিকা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে, যা পরবর্তীতে রোগ প্রতিরোধে দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে।
একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতিতে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের ভাষায়, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, কোনো কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হলে তা দ্রুতই রোগের পুনরুত্থান ও বিস্তার ঘটাতে পারে, যা বর্তমানে দেখা পরিস্থিতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে টিকা ব্যবস্থাপনায় অবনতির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।