শুক্রবার, ১৯ Jun ২০২৬, ০৩:৩২ অপরাহ্ন

৯ বছরেই স্কুলের ছুটি, পর্দায় এসে হলেন ‘বিউটিকুইন’: ঢালিউড কিংবদন্তি শাবানার না-বলা গল্প

বিনোদন ডেস্ক,ঢাকা॥
মাত্র ৯ বছর বয়সেই চুকে গিয়েছিল স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সেই সমাপ্তিই যে রূপালী পর্দার এক মহাকাব্যিক যাত্রার সূচনা ছিল, তা কে জানত! স্কুলছুট সেই ছোট্ট মেয়েটিই নিজের প্রতিভা আর অভিনয়গুণে পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিংবদন্তি।

তিনি আফরোজা সুলতানা রত্না। তবে কোটি দর্শকের কাছে তিনি এক নামে পরিচিত- ‘ঢালিউডের বিউটিকুইন’ শাবানা। পর্দায় অনন্য সাধারণ অভিনয়শৈলী, জাদুকরী উপস্থিতি আর অনবদ্য সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অবিসংবাদিত উচ্চতায়। ১৯৫২ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী অভিনেত্রী। তার বাবা ফয়েজ চৌধুরী এবং মা ফজিলাতুন্নেসা।

শিশুশিল্পী থেকে ঢালিউডের ‘শাবানা’
১৯৬২ সালে প্রখ্যাত পরিচালক আজিজুর রহমানের হাত ধরে মাত্র ১০ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে পা রাখেন রত্না। এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে তার প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো। এরপর কিছুদিন নৃত্যশিল্পী হিসেবেও কাজ করেন। তবে নায়িকা হিসেবে ঢালিউডে আত্মপ্রকাশ করতে তার বেশি সময় লাগেনি; শিশুশিল্পী হিসেবে অভিষেকের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় তিনি মূল চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন।

১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘চকোরী’ চলচ্চিত্রে পাকিস্তানি অভিনেতা নাদিমের বিপরীতে নায়িকা হিসেবে অভিষেক হয় তার। এই ছবির মাধ্যমেই পরিচালক এহতেশাম তার নাম বদলে রাখেন ‘শাবানা’। আর এই নতুন নামেই তিনি চিরতরে খোদাই হয়ে যান বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।

‘সেলাই মেশিন’ ও চিরন্তন বাঙালি নারীর প্রতীক
বাংলা চলচ্চিত্রে শাবানাকে নিয়ে একটি দারুণ কথা প্রচলিত আছে- ‘সেলাই মেশিন মানেই শাবানা’। পর্দায় তিনি অসহায়, সংগ্রামী ও আত্মত্যাগী বাঙালি বধূ কিংবা মায়ের চরিত্রকে এতটাই জীবন্ত করে তুলতেন যে, তা দর্শকের হৃদয়ে আজীবন গেঁথে গেছে। অসংখ্য ছবিতে দেখা গেছে, স্বামীপরিত্যক্তা বা ভাগ্যবিড়ম্বিত এক নারী তার সন্তানকে মানুষ করার কঠিন সংগ্রামে দিনরাত সেলাই মেশিন চালাচ্ছেন। ফলে এই সেলাই মেশিনটি যেন হয়ে উঠেছিল তার অভিনয় জীবনের এক অবিনশ্বর প্রতীক।

 

প্রযোজনা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদচারণা
শুধু অভিনয়ের মাঝেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি শাবানা, সফল হয়েছেন চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও। ১৯৭৪ সালে সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী ওয়াহিদ সাদিকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রী মিলে গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘এস এস প্রোডাকশনস’। এই ব্যানারে ১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় তাদের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মাটির ঘর’। আজিজুর রহমান পরিচালিত এই ছবিতে রাজ্জাক ও শাবানার অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের দারুণ মুগ্ধ করে এবং ছবিটি বিপুল ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। ব্যক্তিগত জীবনে শাবানা ও ওয়াহিদ সাদিক দম্পতি দুই কন্যা (সুমি ও ঊর্মি) এবং এক পুত্রের (নাহিন) জনক-জননী।

অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন শাবানা। ১৯৮৮ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ‘বিরোধ’ চলচ্চিত্রে বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজেশ খান্নার বিপরীতে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসিত হন তিনি। ছবিটি পরবর্তীতে হিন্দিতে ‘শত্রু’ নামে ডাবিং করে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের সাথেও তার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছিল। ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বিশ্বখ্যাত হলিউড অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ন যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন, তখন তিনি এফডিসি পরিদর্শনের সময় শাবানাসহ তৎকালীন দেশের শীর্ষ তারকাদের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন।

পুরস্কারের রেকর্ড ও অনন্য স্বীকৃতি
পুরস্কার অর্জনের দিক থেকেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে শাবানা এক অনন্য ও অপরাজিত নাম। ১৯৭৭ সালে ‘জননী’ চলচ্চিত্রের জন্য তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ‘পার্শ্বচরিত্র’ বিভাগে মনোনীত করা হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ‘সখী তুমি কার’ চলচ্চিত্রের জন্য ক্যারিয়ারের প্রথম ‘সেরা অভিনেত্রী’ হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

পুরো অভিনয় জীবনে তিনি রেকর্ডসংখ্যক মোট ১১ বার সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয় করেছেন, যা আজ পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি অভিনেত্রীর জন্য সর্বোচ্চ ও অক্ষুণ্ণ এক রেকর্ড। চলচ্চিত্রে তার এই আজীবন ও অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘আজীবন সম্মাননা’য় ভূষিত করা হয়।

রূপালী পর্দা বিদায় ও প্রবাস জীবন
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শাবানা মোট ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ঢালিউডের আরেক কিংবদন্তি অভিনেতা আলমগীরের সাথেই জুটি বেঁধেছেন ১৩০টি ছবিতে, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ জুটি বেঁধে অভিনয়ের রেকর্ড। ১৯৯৯ সালে হুট করেই অভিনয় জগৎ থেকে বিদায় নিয়ে সপরিবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন তিনি। তবে তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ মুক্তি পায় ২০০১ সালে; আজিজুর রহমান পরিচালিত এই ছবিটিই ছিল জনপ্রিয় ‘শাবানা-আলমগীর’ জুটির শেষ সিনেমা।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী হওয়ার পর সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসেছিলেন এই অভিনেত্রী এবং ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আবার ফিরে যান। এরপর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও আর দেশে ফেরা হয়নি তার। তবে রূপালী পর্দার আলো-ঝলমলে জগৎ থেকে দূরে থাকলেও, বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী ইতিহাসে এবং কোটি দর্শকের হৃদয়ে শাবানা আজও এক অমলিন ও উজ্জ্বল কিংবদন্তি হয়েই বিরাজ করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com