বুধবার, ০৩ Jun ২০২৬, ১১:৪০ অপরাহ্ন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন: বিএনপিতে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও সহিংসতার আশঙ্কা

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা ॥
আগামী অক্টোবর থেকে দেশজুড়ে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা করছে সরকার। গত ১২ ফেব্রুয়ারির, ২০২৬ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দল অনেকে একক প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠ চষে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিতে এই নির্বাচনকে ঘিরে অন্তর্কোন্দল, ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এবং সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রতীকহীন নির্বাচনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ
দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় বিএনপির একক প্রার্থী নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন:
“সরকারপ্রধান বলেছেন স্থানীয় নির্বাচন শিগগিরই হবে এবং প্রার্থীদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ও তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। তাদের প্রস্তুতির ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে। অবশ্য রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি নিজেদের অবস্থান থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে।”

সাংগঠনিক তৎপরতা ও কঠোর বার্তা
জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে দেখছে বিএনপি। গত ৯ মে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিএনপি এবং এর তিন সহযোগী সংগঠন- যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিগত সংসদ নির্বাচনের পর এটিই ছিল দলের সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক সভা।

উক্ত বৈঠকে তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার বার্তা দেন। তবে সভায় বিগত সংসদ নির্বাচনে দলের অর্ধশতাধিক ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গ এবং আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনেও এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বিশেষ দায়িত্ব: সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করতে বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা মাঠপর্যায়ের প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলার আহ্বান জানাবেন।

নেতৃবৃন্দের সংশয়: দলের পক্ষ থেকে কড়া বার্তা দেওয়া হলেও স্থানীয় নেতারা শেষ পর্যন্ত একমত হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে খোদ কেন্দ্রীয় নেতাদের মনেই সংশয় রয়েছে।

শূন্যতা ও ভোটের সমীকরণ
গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিগত আওয়ামী লীগ আমলের সিটি ও পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করে এবং জেলা ও উপজেলা পরিষদ ভেঙে দেয়। ইউনিয়ন পরিষদের সিংহভাগ প্রতিনিধি পলাতক থাকায় সরকারি কর্মকর্তারা সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রশাসনিক শূন্যতার মাঝেই তৃণমূল থেকে পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করার আভাস পাওয়া গেছে।

দলীয় প্রতীক না থাকায় এবার ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ‘ইমেজ’ প্রধান্য পাবে। এই সুযোগে আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত ‘ক্লিন ইমেজ’ সম্পন্ন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে বিএনপিকে একাধারে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিপক্ষের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কেন্দ্রীয় নেতাদের ভয়, দলের কেউ ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকলে ভোট ভাগাভাগির পূর্ণ সুবিধা নেবে প্রতিপক্ষ দলগুলো।

সরকারের নির্বাচনী রোডম্যাপ
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নির্বাচন প্রসঙ্গে জানিয়েছেন:

“চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com