বুধবার, ০৩ Jun ২০২৬, ১১:৩৯ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত অর্থনৈতিক প্রতিবেদন:: দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে। মোট ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসের ব্যবধানে দেশের ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি। দেশের ব্যাংকগুলোয় এখন মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক গত মার্চ পর্যন্ত হিসাব শেষ করে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
জানা যায়, ঋণখেলাপি হলে ব্যাংক খাতে তীব্র তারল্য সংকট (লিকুইডিটি) দেখা দেয়, যার ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের আমানতের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয় এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারায়; খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক প্রভিশন বা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধন কমে যায়, যা বড় ধরনের অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এর আগে ঋণ আদায় ও পুনঃতপশিল সুবিধায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নবায়ন হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ বড় লাফ দিয়েছিল। গত ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমলেও পরের প্রান্তিকে তা বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি তপশিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। আর এখন মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ। তবে এসব ব্যাংকে আগের প্রান্তিকের চেয়ে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমেছে। সব মিলিয়ে ওই সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে ২০১৯ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ লাখের ঘর পেরিয়ে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা হয়। এর পর থেকে ধীরে ধীরে স্তূপাকারে জমা হতে থাকে খেলাপি ঋণ। ওই সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের মেয়াদে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু হয়। ওই সময় আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থক অনেক গ্রাহক আত্মগোপনে চলে যায়। ফলে খেলাপি ঋণ হুহু করে বেড়ে যায়। এমন অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেয়। তাতে খেলাপি ঋণ কমে আসে।
ব্যাংকারদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও সীমাহীন দুর্নীতির প্রভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী এবং ন্যাশনাল, ইসলামী ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক। সেজন্য আগের খেলাপি সুদ যোগ হয়ে মোট খেলাপির পরিমাণ ও হার দুটোই বেড়েছে। ঋণ চাহিদা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বন্ধ কারখানা চালু ও অর্থনীতি সক্রিয় করতে।