শুক্রবার, ১৯ Jun ২০২৬, ০৩:৩১ অপরাহ্ন
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, অর্থনীতি ডেস্ক ॥
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা বা ৪১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইটজারল্যান্ড ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি) প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা (৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁ)। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই জমার পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা বা ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ফ্রাঁ।
ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল মাত্র ২৬৪ কোটি টাকা এবং ২০২২ সালে তা ছিল ৮২৪ কোটি টাকা। তবে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল অবিশ্বাস্য- প্রায় ৩,২৪৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের এই আমানতের পরিমাণ এখন পর্যন্ত ইতিহাসে রেকর্ড হওয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকায় (৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ) পৌঁছেছিল। এবারের আমানত সেই রেকর্ড ছোঁয়ার একেবারে কাছাকাছি।
তবে এসএনবি-র এই প্রতিবেদনটি মূলত সুইস ব্যাংকগুলোর সরকারি হিসাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের কথিত ‘কালোটাকা’র প্রকৃত বা গোপন পরিমাণ নির্দেশ করে না।
আমানতের সিংহভাগই বাণিজ্যিক ব্যাংকের, কমেছে ব্যক্তিগত জমা
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রাখা আমানতের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা ২০২৪ সালে ছিল ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ফ্রাঁ। অবাক করার মতো বিষয় হলো, সুইস ব্যাংকে থাকা মোট বাংলাদেশি আমানতের প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ, অথচ ২০২৩ সালে এই হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ছিল ৩৫ শতাংশ।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এই বিপুল অঙ্কের আমানত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন,
“সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর রাখা অর্থ মূলত স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ। ব্যাংকগুলো কোথায় ভালো মুনাফা পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। বিনিয়োগের সুযোগ ও রিটার্নের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকগুলো নিয়মিত বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বছরে সুইজারল্যান্ডে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে মানেই অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে এমন ধারণা সঠিক নয়।”
অন্যদিকে, ব্যক্তিগত হিসাবের মাধ্যমে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত রাখার প্রবণতা কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত আমানত প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ-তে নেমে এসেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ।
বৈশ্বিক স্বচ্ছতা ও বাংলাদেশের অবস্থান
একসময় গ্রাহকের চরম গোপনীয়তা রক্ষার জন্য পরিচিত সুইস ব্যাংকগুলো বর্তমানে অর্থ পাচার ও করফাঁকি রোধে কঠোর স্বচ্ছতা নীতি অনুসরণ করছে। এই লক্ষ্যে ২০১৮ সাল থেকে চালু করা হয়েছে ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ (এএইওআই) কার্যক্রম। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের কর কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক নাগরিকদের আর্থিক হিসাবের তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। ২০২৫ সালে সুইস ফেডারেল ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফটিএ) বিশ্বের ১০১টি দেশের সাথে প্রায় ৩৪ লাখ আর্থিক হিসাবের তথ্য বিনিময় করেছে।
তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) গ্লোবাল ফোরামের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ এখনো এই স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থায় (এএইওআই) অংশগ্রহণের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। বিপরীতে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে এই তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার অংশ হয়ে নাগরিকদের হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র: শীর্ষে ভারত, প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে বাংলাদেশ
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে বরাবরের মতোই সর্বোচ্চ আমানত রয়েছে ভারতের। ভারতীয় ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, যদিও তা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ কমেছে।
এই অঞ্চলের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এবং একমাত্র বড় অর্থনীতি হিসেবে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অন্যদিকে, শতকরা হিসাবে সবচেয়ে বেশি আমানত বেড়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের। দেশটিতে আমানত ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ হলেও মোট অঙ্কের দিক থেকে তা খুবই সামান্য।
সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও ভুটানের আমানত কমলেও বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের আমানত বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতামত:
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আমানতের এই সাম্প্রতিক উল্লম্ফনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বৃদ্ধি। ফলে এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি অবৈধ অর্থ বা কালো টাকা পাচারের সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থায় (এএইওআই) বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না থাকায়, বিদেশে বাংলাদেশিদের ব্যক্তিগত প্রকৃত আর্থিক সম্পদের বা পাচার হওয়া অর্থের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া এখনো কঠিন রয়ে গেছে।