শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৬ অপরাহ্ন

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার মারা গেছেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, একুশের কন্ঠ অনলাইন:: যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর।

বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কিসিঞ্জারের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় সময় বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে তার নিজ বাড়িতে মারা গেছেন জার্মান বংশোদ্ভূত সাবেক এ কূটনীতিক।

হেনরি কিসিঞ্জার জন্মেছিলেন নাৎসি জার্মানিতে ১৯২৩ সালের ২৭ মে। তবে ১৫ বছর বয়সেই পরিবারসহ নিউ ইয়র্কে পাড়ি জমান কিসিঞ্জার। পরিবারের আর্থিক অবস্থা তখন নিতান্ত করুণ, তাই বাধ্য হয়ে কিশোর কিসিঞ্জারকে শেভিং ব্রাশের ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করতে হয়। পাশাপাশি অবশ্য তিনি জর্জ ওয়াশিংটন হাই স্কুলে নিয়মিত রাত্রীকালীন পড়া চালিয়ে গিয়েছিলেন।

সিটি কলেজ অভ নিউ ইয়র্কে পড়ার সময় ১৯ বছর বয়সে কিসিঞ্জারকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। প্রথমে তিনি ফ্রান্সে একজন রাইফ্যালম্যান এবং পরে জার্মানিতে জি-টু ইন্টেলিজেন্স অফিসার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনীর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স কোরের সাথে কাজ করেন।

বিশ বছর বয়সে নিজের নাম পাল্টে হেইঞ্জ কিসিঞ্জার থেকে হয়ে যায় হেনরি কিসিঞ্জার। সাথে সাথে জুটে যায় মার্কিন নাগরিকত্বও।

১৯৪৭ সালে কিসিঞ্জার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে ভর্তি হন হার্ভার্ড কলেজে। তিনবছর পর সেখান থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিস্টিংশন সহ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে চলে যান উচ্চতর শিক্ষার জন্য। সেখানে ১৯৫২ সালে মাস্টার্স ডিগ্রী এবং ১৯৫৪ সালে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন।

১৯৬৮ সালে তিনি রিপাবলিকান মনোনয়নপ্রার্থী নেলসন রকফেলারের হয়ে কাজ করেন, যদিও রকফেলার সেবার নিক্সনের কাছে পরাজিত হন। রিচার্ড নিক্সন প্রেসিডেন্ট হয়ে রকফেলারের অনুরোধে হেনরি কিসিঞ্জারকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে নিয়োজিত করেন। নতুন কর্তৃত্ব পেয়েই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন হেনরি কিসিঞ্জার। ঐ সময়ের যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্ক নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি।

হেনরি কিসিঞ্জারের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সাথে ভিয়েতনাম জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। ভিয়েতনামের যুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিল আমেরিকা। ভিয়েতনাম প্রসঙ্গে হেনরি কিসিঞ্জারকে যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দিয়েছেন অনেক সমালোচক।

১৯৭৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন হেনরি কিসিঞ্জার। এই সময় তার ইচ্ছাতেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পরিবর্তন আসে। ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’ (একাধিক রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা) নামে পরিচিত এই কূটনৈতিক প্রয়াসে কিসিঞ্জার তৃতীয় ব্যাক্তি হিসেবে আরব দেশগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন সম্পর্কিত আলোচনায় সহায়তা করেন। এই লক্ষ্যে কিসিঞ্জার মিশর, ইজরায়েল, সিরিয়া ইত্যাদি আরবদেশে অনেকবার চক্কর দিয়েছিলেন। প্রায় এগার বার এরকম ‘শাটল মিশন’ পরিচালনা করেন কিসিঞ্জার, যার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ মিশনটির স্থায়িত্ব ছিল একমাসের মতো।

চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন: বলির পাঁঠা বাংলাদেশ

ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যকার সুসম্পর্কই কিসিঞ্জারকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি ভেবেছিলেন এতে করে উপমহাদেশে সোভিয়েত প্রভাব মারাত্মক বেড়ে যাবে। তাই এই সমস্যা সমাধানে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর এসব কিছু হয়েছিল কিসিঞ্জারের তত্ত্বাবধানে।

চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নের ঘটনাটি রিয়ালপলিটিকের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রিয়ালপলিটিক হচ্ছে এমন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে কাগজ-কলমের তত্ত্বের চেয়ে রাজনীতির বাস্তবিক প্রয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ‘পিংপং ডিপ্লোম্যাসি’ খ্যাত এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পেছনে মূল কলকাঠি নাড়েন কিসিঞ্জার। পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সহযোগিতায় হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন ভ্রমণ করে চীনে নিক্সনের জন্য একটি সরকারি ভ্রমণের ব্যবস্থা করেন, যার ফলশ্রুতিতে নিক্সন ১৯৭২ সালে চীন ভ্রমণ করেন।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্পর্ক উন্নয়ন দুই দেশের নেতারাই অনেকদিন থেকে মনে-প্রাণে চেয়ে আসছিলেন। ফলে ১৯৭১ সালে যখন সুযোগটি এলো আর সেখানে পাকিস্তানের সহায়তা ছিল (রোমানিয়ার সরকারও যুক্ত ছিল) তখন নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি মার্চ মাসে পাকিস্তানের বর্বর গণহত্যার বিষয়টিকে নীরবে সমর্থন দিয়ে এলেন। এমনকি আর্চার কে. ব্লাড যখন ২৫শে মার্চের ধ্বংসযজ্ঞকে সরাসরি গণহত্যা বলে অভিহিত করে ওয়াশিংটনে তারবার্তা পাঠান, যেটি ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে খ্যাত, সেটি সম্পূর্ণভাবে শুধু এড়িয়ে গিয়েই ক্ষান্ত হননি নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি, বরং বাংলাদেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ব্লাডকে তার ঢাকা অফিস থেকে অব্যাহতি দিয়ে ওয়াশিংটনে স্থানান্তর করা হয়। ঐ সময় দিল্লিতে থাকা মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিটিং পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বললে ‘তার মাথা ভারতীয়রা গুলিয়ে খেয়েছে’ বলে অভিযোগ করেন কিসিঞ্জার। নিজেদের জাতীয় স্বার্থে মানবতাকে প্রকারান্তরে বুড়ো আঙুল দেখান কিসিঞ্জার-নিক্সন জুটি।

এদিকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেও ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন কিসিঞ্জার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় হেনরি কিসিঞ্জার ইন্দিরা গান্ধীর ওপর নাখোশ ছিলেন। এমনকি তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করেন। অবশ্য পরে তিনি তার মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন।

এদিকে, নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা হচ্ছে কিসিঞ্জারের নোবেল শান্তি পুরষ্কার লাভ। এর কারণ ছিল একদিকে মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমানগুলো উত্তর ভিয়েতনামে বোমাবর্ষণ করে চলছে, অন্যদিকে একই সাথে হেনরি কিসিঞ্জার শান্তিচুক্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্যারিস শান্তি চুক্তি কার্যকর হয় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে। সেই বছরই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন হেনরি কিসিঞ্জার ও লি ডাক থো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com