মঙ্গলবার, ০৭ Jul ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রকে কাঁদিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম

ছবি: সংগৃহীত

স্পোর্টস ডেস্ক:: যুক্তরাষ্ট্র ঘরের মাঠে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিল। লক্ষ্য একটাই, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। কিন্তু মাঠে খেলা শুরু হতেই সেই স্বপ্ন বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের আক্রমণের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। পুরো ম্যাচের গল্পটা যেন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক ভুল আর বেলজিয়ামের নির্মমভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর উপাখ্যান।

ম্যাচের সময় তখন মাত্র ৯ মিনিট। যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্ডাররা নিজেদের ডিবক্সের ভেতর খুব সহজ একটা বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। সেই নড়বড়ে ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে চিলির মতো ক্ষিপ্রতায় বল কেড়ে নেন চার্লস ডি কেটেলারে। গোলরক্ষককে একা পেয়ে অত্যন্ত নিখুঁত এবং ঠান্ডা মাথার শটে বল জালে জড়িয়ে বেলজিয়ামকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন এই ফরোয়ার্ড।

হঠাৎ গোল খেয়ে ধাক্কা খাওয়া যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য হাল ছাড়েনি। তারা আক্রমণের ধার বাড়ায় এবং ৩১তম মিনিটে উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। বক্সের কিছুটা বাইরে ফ্রি-কিক পায় স্বাগতিকরা। মালিক টিলম্যানের নেওয়া দুর্দান্ত, বাঁকানো ফ্রি-কিকটি বেলজিয়ামের রক্ষণভাগ আর গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে সরাসরি জালে জড়ায়। ১-১ গোলে সমতায় ফেরে ম্যাচ।

কিন্তু মার্কিন সমর্থকদের সেই আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র দুই মিনিটেরও কম সময়। সমতায় ফেরার রেশ কাটার আগেই ৩৩তম মিনিটে বাঁ দিক থেকে লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের মাপা এক ক্রস উড়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের ডি-বক্সে। সেখানে অভিজ্ঞ মার্কিন ডিফেন্ডার টিম রিমকে পুরোপুরি পরাস্ত করে, শূন্যে লাফিয়ে এক বুলেট গতির হেডে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন সেই ডি কেটেলারে। বেলজিয়াম এগিয়ে যায় ২-১ ব্যবধানে। প্রথমার্ধের বাকি সময়টায় বেলজিয়ামের হাই-প্রেসিং ফুটবলের সামনে কার্যত কোণঠাসা হয়েই পার করে যুক্তরাষ্ট্র।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিল স্বাগতিকরা, কিন্তু ৫৭তম মিনিটে ঘটে যাওয়া এক ব্লান্ডার তাদের ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে দেয়। বেলজিয়ামের একটি কাউন্টার অ্যাটাক রুখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোলরক্ষক ম্যাট ফ্রিজ বক্স ছেড়ে অনেকখানি বাইরে চলে আসেন। কিন্তু বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তিনি মারাত্মক ভুল করে বসেন। বল পেয়ে যান বেলজিয়ামের হান্স ভানাকেন। সামনে তখন কোনো গোলরক্ষক নেই, ফাঁকা পোস্ট! অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় দূর থেকেই ফাঁকা জালে বল ঠেলে দিয়ে স্কোরলাইন ৩-১ করে ফেলেন ভানাকেন। এই গোলের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফেরার সব আশার আলো নিভে যায়।

ম্যাচের একদম শেষ দিকে, যোগ করা সময়ে (ইনজুরি টাইমে) বেলজিয়ামের বড় জয় নিশ্চিত করতে শেষ পেরেকটি ঠোকেন বদলি হিসেবে নামা তারকা স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু। মাঝ মাঠ থেকে রক্ষণ চেরা এক পাস ধরে নিজের চেনা শক্তিমত্তা ও গতির প্রদর্শনীতে মার্কিন ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করেন তিনি। এরপর গোলরক্ষকের পাশ দিয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠালে বেলজিয়াম ৪-১ গোলের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।

গোলের এই রোমাঞ্চকর গল্পের বাইরেও ম্যাচে ছিল কিছু অন্যরকম নাটকীয়তা। ম্যাচের আগে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন। লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ায় এই ম্যাচে তার খেলা নিয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সবাই ভাবছিল বিতর্ক পেছনে ফেলে তিনি হয়তো মাঠে জাদুকরী কিছু করবেন। কিন্তু বেলজিয়ামের ডিফেন্ডাররা তাকে পুরো ম্যাচজুড়ে বোতলবন্দী করে রেখেছিল। প্রথমার্ধে টিলম্যানের গোলের আগে একটা ফাউল আদায় করা ছাড়া পুরো ম্যাচে তিনি আর কিছুই করতে পারেননি। শেষদিকে একটি ভালো সুযোগ পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু বেলজিয়ামের প্রাচীর থিবো কোর্তোয়া দুর্দান্ত এক সেভে তার সেই চেষ্টাও ব্যর্থ করে দেন।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি মার্কিন অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচের বিদায়। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া এই তারকা ঘরের মাঠের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরতে পারছিলেন না। তার ওপর ৫৯তম মিনিটে চোট পেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, চোখে জল নিয়ে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। নিজের সেরা সময়ে থেকেও ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে কোনো গোল না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়েই শেষ হলো তার বিশ্বকাপ মিশন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়টা ছিল তাদের নিজেদের ভুলে ভরা পারফরম্যান্সের ফল। মাঝমাঠে একের পর এক ভুল পাস, আক্রমণে ধারহীনতা আর ডিফেন্সের সমন্বয়হীনতার কারণে তারা বেলজিয়ামের প্রেসিং গেমের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। অন্যদিকে, নিজেদের শক্তিমত্তা ও অভিজ্ঞতার জানান দিয়ে ৪-১ গোলের বড় জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটে নিল বেলজিয়াম, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে শক্তিশালী স্পেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com