শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৫৮ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধি, নবাবগঞ্জ ঃ
বৈঠার প্রতিটি আঘাতে যখন রঙিন নৌকাগুলো ছুটে চলছিল ইছামতীর বুক চিরে, তখন নদীর দুই পাড়ে উঠছিল হাজারো মানুষের উল্লাস। ঢাকের বাদ্য, মাঝিদের হুংকার আর দর্শকদের করতালিতে শুক্রবার বিকেলে ঢাকার নবাবগঞ্জের কলাকোপায় ইছামতী যেন ফিরে পেয়েছিল তার হারানো প্রাণ।
নৌকাবাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড়জুড়ে সৃষ্টি হয় মানুষের ঢল—পরিণত হয় এক বিশাল গ্রামীণ মিলনমেলায়। বর্ষার ভাদ্র মাস এলেই গ্রামবাংলার নদী-বিলের বুকে জমে উঠত নৌকাবাইচের আসর। সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে গেলেও কলাকোপার ইছামতীতে বর্ণিল এই আয়োজন নতুন করে সেই সংস্কৃতির স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও নদী, মানুষ আর লোকজ সংস্কৃতি একাকার হয়ে যায় উৎসবের আবহে।
সমসাবাদ মডেল মসজিদ ঘাট থেকে কলাকোপা আনসার ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার নদীপাড়ে ছিল মানুষের সরব উপস্থিতি। নদীর পাড়, সেতু ও আশপাশের উঁচু স্থান—কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। নারী, পুরুষ ও শিশুর পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা পরিবারগুলোও উৎসবে যোগ দেয়। অনেকে আবার ট্রলার ও নৌকায় উঠে নদীর মাঝ থেকেই প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। কলাকোপা, সমসাবাদ, হরিশকুল, জালালচর ও ময়মন্দি—এই পাঁচ গ্রামের যুবসমাজের উদ্যোগে আয়োজিত হয় নৌকাবাইচ। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১২টি নৌকা এতে অংশ নেয়।
বিকেলে প্রতিযোগী নৌকাগুলো ইছামতীর পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পুরো পরিবেশ। মাঝিদের সমন্বিত বৈঠার আঘাতে একের পর এক নৌকা ছুটে যায় সামনের দিকে। কখনো পাশাপাশি, কখনো কয়েক হাত ব্যবধানে এগিয়ে চলা নৌকাগুলোকে ঘিরে তীরে থাকা দর্শকদের মধ্যে শুরু হয় তুমুল উত্তেজনা।
নৌকা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের করতালি ও উল্লাসও বাড়তে থাকে। ঢাক-ঢোলের শব্দ আর মাঝিদের ছন্দময় হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে ইছামতির বুক। নবাবগঞ্জ ও দোহার ছাড়াও শ্রীনগর, সিরাজদিখান এবং মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর ও হরিরামপুর থেকেও অনেকে পরিবার নিয়ে ট্রলারযোগে নৌকাবাইচ দেখতে আসেন।
স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা ছিল না; ছিল বহুদিন পর একসঙ্গে আনন্দ করার উপলক্ষ। দীর্ঘদিন পর এমন বড় আয়োজন দেখতে পেয়ে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ। নদীর দুই পাড়ে বসে নানা ধরনের খাবার, খেলনা ও পণ্যের দোকান। ফলে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও তৈরি হয় বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো এলাকা ছিল উৎসবের রঙে রাঙানো।

নৌকাবাইচ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক। তিনি ইছামতীতে নৌকাবাইচ উপভোগ করেন এবং আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে নদীতে ঘুরে দর্শনার্থীদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। তবে নব-নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পুরস্কার বিতরণের আগেই তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
বাইচ শেষে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন বিএনপির উপজেলা সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আবুল কালাম, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. শাহ আলম, শিক্ষানুরাগী আবু শফিক খন্দকার, কলাকোপা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান বাবু লাল মোদকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নৌকাবাইচ কেবল বিনোদন নয়—এটি গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। এমন আয়োজন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শেকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করে।
তাঁদের দাবি, ইছামতী নদীর ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর নিয়মিত নৌকাবাইচের আয়োজন করা হোক। একই সঙ্গে নদীকে ঘিরে লোকজ সংস্কৃতি ও পর্যটনকেন্দ্রিক আয়োজন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও গতিশীল হতে পারে।
ইছামতীর বুকে শুক্রবারের নৌকাবাইচ শেষ হয়েছে সন্ধ্যার সঙ্গে। কিন্তু বৈঠার সেই ছন্দ, হাজারো মানুষের উল্লাস আর গ্রামবাংলার মিলনমেলার স্মৃতি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জনপদে। নদীর বুকের এই আয়োজন যেন বলে গেল—সুযোগ পেলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য এখনো মানুষের হৃদয়ে জেগে উঠতে পারে।