বৃহস্পতিবার, ১৬ Jul ২০২৬, ০২:৪০ পূর্বাহ্ন

বিশ্বকাপ ফুটবলে আজ আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড মহারণ

স্পোর্টস ডেস্ক:: ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড আজ মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে। ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার এই মহারণে মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং দীর্ঘ ৬০ বছর পর বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্বপ্নে থাকা ইংল্যান্ড।

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার বিখ্যাত মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে হাইভোল্টেজ এই ম্যাচ। দুই দলের শক্তি, ইতিহাস, তারকা খেলোয়াড় এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সবকিছু মিলিয়ে ম্যাচটি ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল উত্তেজনা। ফুটবলপ্রেমীদের চোখ এখন আটলান্টার দিকে।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের এই লড়াইয়ে কোনো দলকেই এককভাবে ফেবারিট বলা যাচ্ছে না। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফুটবল বিশ্লেষণ ব্যবস্থা অপ্টা সুপার কম্পিউটারের পূর্বাভাসে সামান্য এগিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড।

অপ্টার সুপার কম্পিউটারের হিসাব অনুযায়ী, ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনায় ইংল্যান্ডের পাল্লা ভারী। তাদের জয়ের সম্ভাবনা ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ, আর আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ। যদিও মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে এই পরিসংখ্যান কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে অভিজ্ঞতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। এই সেমিফাইনালে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দুই দলের তারকা খেলোয়াড়দের লড়াই।

আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের নেতৃত্বে থাকবেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। তার সঙ্গে থাকবেন লাউতারো মার্টিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারদের ওপরও থাকবে বড় দায়িত্ব।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের মূল ভরসা অধিনায়ক হ্যারি কেইন, তরুণ তারকা জুড বেলিংহাম, ডেকলান রাইস ও অ্যান্থনি গর্ডন। চলতি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের কেইন ও বেলিংহাম দুজনেই করেছেন ৬টি করে গোল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একই আসরে একই দেশের দুই খেলোয়াড়ের ৬ বা তার বেশি গোল করার ঘটনা এটিই প্রথম। ফলে আজকের ম্যাচে একদিকে থাকবে মেসির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে বেলিংহামের দুর্দান্ত তারুণ্য ও গতি।

কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচের শুরুতে পিছিয়ে পড়লেও শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ায় থ্রি লায়ন্সরা। অতিরিক্ত সময়ে জুড বেলিংহামের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড। এই জয়ে দলটির আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে।

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন এবার আরও বড় হয়ে উঠেছে ইংলিশদের সামনে। ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ জিতেছিল ইংল্যান্ড। এরপর আর শিরোপা ছুঁতে পারেনি তারা।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা পুরো টুর্নামেন্টে দেখিয়েছে ধারাবাহিকতা। এখন পর্যন্ত ১৭টি গোল করেছে লিওনেল স্কালোনির দল। আর একটি গোল করলেই বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ ১৮ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করবে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেমিফাইনালে কখনো হারেনি আর্জেন্টিনা। ফলে এই ম্যাচে আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামবে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

মেসির নেতৃত্বে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য তাদের। একই সঙ্গে মেসির শেষ বিশ্বকাপের স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে এই ম্যাচে। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু পুরোনো। বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই দলের লড়াই বরাবরই পেয়েছে বাড়তি গুরুত্ব।

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। তবে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল দুই দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি। সেই ম্যাচে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ঐতিহাসিক ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র সুবাদে ২-১ গোলে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।

১৯৯৮ বিশ্বকাপেও শেষ ষোলোতে মুখোমুখি হয় দুই দল। টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহ্যাম লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। চার বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে গোল করে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডকে জয় এনে দেন বেকহ্যাম।

দুই দেশের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক ইতিহাসও। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। সেই কারণে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই শুধু ফুটবল নয়, আবেগ ও জাতীয় গৌরবের লড়াই। আজকের সেমিফাইনালেও সেই উত্তাপ থাকবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

ম্যাচকে ঘিরে আটলান্টায় নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্টেডিয়াম, দুই দলের হোটেল, ফ্যান জোন এবং ডাউনটাউন এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। প্রায় ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য এবং পাঁচ শতাধিক বেসামরিক নিরাপত্তাকর্মী নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা সদস্যের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ আচরণের আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। উচ্ছৃঙ্খলতা এড়িয়ে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে দর্শকদের।

মাঠের ভেতরে থাকবে মেসি-কেইনের লড়াই, বেলিংহাম-আলভারেজদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। মাঠের বাইরে থাকবে সমর্থকদের আবেগ, টিকিটের চাহিদা এবং নিরাপত্তার কড়াকড়ি। সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল হয়ে উঠেছে বিশ্বকাপের অন্যতম প্রতীক্ষিত ম্যাচ।

একদিকে ফাইনালে যাওয়ার পথে অপরাজিত ইতিহাস ধরে রাখতে চায় আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন পূরণ করতে চায় ইংল্যান্ড। আটলান্টা প্রস্তুত। এখন অপেক্ষা শুধু বল গড়ানোর—কে পাবে ফাইনালের টিকিট, মেসির আর্জেন্টিনা নাকি কেইনের ইংল্যান্ড?

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com