সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে অর্থ জোগাতে পর্নোগ্রাফি বৈধ করার উদ্যোগ নিয়েছে ইউক্রেন। দেশটির অর্থনীতি চাঙ্গা করার পাশাপাশি এ খাত থেকে কর আদায়ের মাধ্যমে যুদ্ধের তহবিল বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
বর্তমানে ইউক্রেনে পর্নোগ্রাফি তৈরি, সংরক্ষণ ও বিতরণ বেআইনি। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটিতে প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনভিত্তিক কনটেন্টের ব্যবসা বড় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ইয়ারোস্লাভ জেলেজনিয়াক পর্নোগ্রাফি বৈধ করার একটি বিলের পক্ষে কাজ করছেন। তার হিসাব অনুযায়ী, এ খাত বৈধ করা হলে ইউক্রেন বছরে সর্বোচ্চ ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার কর রাজস্ব পেতে পারে। এই অর্থ যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
জেলেজনিয়াকের দাবি, এই অর্থ দিয়ে প্রায় ৩০ হাজার ড্রোন কেনার খরচ জোগানো সম্ভব হতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জেলেজনিয়াক বলেন, বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য পরিস্থিতি একটি ‘দুঃখজনক ও হাস্যকর’ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। কারণ তারা কর না দিলে কর ফাঁকির অভিযোগে অপরাধের মুখোমুখি হচ্ছেন, আবার কর দিলে পর্নোগ্রাফি আইনের আওতায় অপরাধের অভিযোগ উঠছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতাদের কাছ থেকে কর দাবি করা শুরু করেছে। কিন্তু কর পরিশোধ করলে তারা কার্যত নিজেদের এমন একটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করছেন, যা দেশটির আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আগে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদন শিল্পের কর্মকাণ্ড অনেকটা উপেক্ষা করত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির তিনটি অঞ্চলে ঘুষ হিসেবে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে ইউক্রেনের প্রায় ৭ হাজার ৯০০ মানুষ অনলি ফ্যানস থেকে মোট ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করেছেন। অনলি ফ্যানসের মূল প্রতিষ্ঠান ফেনিক্স ইন্টারন্যাশনালের তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব দেওয়া হয়েছে।
তবে করসংক্রান্ত তথ্য জমা দেওয়ার পরও অনেক কনটেন্ট নির্মাতা আইনি জটিলতায় পড়েছেন। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে কয়েকজন নির্মাতাকে চিঠি পাঠিয়ে তাদের কর ফাঁকির পাশাপাশি অবৈধভাবে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট তৈরির অভিযোগের মুখোমুখি করা হয়েছে।
এমনই একজন স্বেতলানা দভোরনিকোভা। তিনি জানান, এক সকালে মেয়েকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করার সময় পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার ডলার নগদ অর্থ, একটি ল্যাপটপ ও কয়েকটি হার্ডড্রাইভ জব্দ করে।
দভোরনিকোভার দাবি, পুলিশ কর্মকর্তারা ওয়েবক্যাম মডেলদের একটি তালিকা এবং তাদের ঠিকানাও জানতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তারা বিষয়টি গোপন রাখার বিনিময়ে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
আরেক নারীও একই ধরনের পুলিশি তল্লাশির মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন। পরে তাকে আদালতে হাজির হতে বলা হলেও ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ার আশঙ্কায় তিনি আদালতে যাননি বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানান।
আইনি লড়াইয়ে থাকা একাধিক অনলি ফ্যানস মডেল এরই মধ্যে ইউক্রেন ছেড়ে অন্য ইউরোপীয় দেশে চলে গেছেন। কর আইনজীবী লেসিয়া মিখালেঙ্কো, যিনি শতাধিক অনলি ফ্যানস মডেলের হয়ে আইনি সহায়তা দিয়েছেন, এ ধরনের মামলাকে ‘ভুক্তভোগীহীন অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মিখালেঙ্কোর মতে, যুদ্ধের সময়ে দেশের প্রতিরক্ষায় মনোযোগ দেওয়ার বদলে এ ধরনের মামলার কারণে আইনি ব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হচ্ছে।
দভোরনিকোভার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওয়েবসাইটে একটি আবেদন করেন। সেখানে নিজেকে নিয়মিত করদাতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, তাকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে সরকার বরং তার কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ৯ লাখ ডলার করের জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।
আবেদনটি এক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি স্বাক্ষর পায়। এরপর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি পার্লামেন্টকে পর্নোগ্রাফি বৈধ করার বিষয়ে জেলেজনিয়াকের বিলটি বিবেচনার কথা বলেন।
জেলেজনিয়াকসহ কয়েকজন আইনপ্রণেতার যৌথভাবে তৈরি করা বিলটি চলতি বছরের জুলাইয়ে ইউক্রেনের পার্লামেন্টে প্রথম দফার ভোটে পাস হয়েছে। এখন বিলটির দ্বিতীয় দফা পাঠের অপেক্ষা রয়েছে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল