সোমবার, ২২ Jun ২০২৬, ১০:৩৮ অপরাহ্ন

চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শতকোটি সম্পদের অভিযোগে তাজুল

চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শতকোটি সম্পদের অভিযোগে তাজুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলামকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসছে। জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে পদোন্নতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, চাকরি বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং নামে-বেনামে শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগে তাকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই প্রতিবেদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানে ভুক্তভোগী, স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভিযোগের পরিধি শুধু প্রশাসনিক অনিয়মে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার সম্পদের উৎস, পদোন্নতির বৈধতা এবং প্রভাববলয়ের বিস্তার নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

দারিদ্র্য থেকে বিত্তের পাহাড়, কোথা থেকে এলো এত সম্পদ?
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সাংঘাইল গ্রামের বাসিন্দা তাজুল ইসলাম একসময় মাস্টাররোলে এমএলএস (চতুর্থ শ্রেণির) কর্মচারী হিসেবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে অফিস সহায়ক পদে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিনি জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই পদোন্নতির নথিপত্র পুনঃযাচাই করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

নারায়ণগঞ্জ থেকেই গড়ে ওঠে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট
অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, নারায়ণগঞ্জে কর্মরত অবস্থায় তাজুল ইসলাম একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আর্থিক লেনদেনে হস্তক্ষেপ করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স নিজের ও স্বজনদের নামে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।

চাকরি বাণিজ্যের অভিযোগে একাধিক ভুক্তভোগী
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। তাদের অভিযোগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে চাকরি দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। দেবপাল এলাকার এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। চাকরি না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে তাকে ভয়ভীতি ও বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তাজুল ইসলাম। সেই সময় নিজের, ছেলে ও ভাইদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে আগের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।

বদলি হলেও ঢাকাতেই সক্রিয়?
অভিযোগ ওঠার পর তাকে মানিকগঞ্জে বদলি করা হলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি এখনও ঢাকায় অবস্থান করে অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন। বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্পদের পাহাড় অনুসন্ধানে যা মিলল
এই প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মেরাজনগর বি-ব্লকে তার তিনটি বাড়ি রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। গ্রামের বাড়িতে পাঁচ কাঠা জমির ওপর নির্মিত হয়েছে দুইতলা আলিশান ভবন। এছাড়া তার ভাইয়ের নামে গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ারের তৃতীয় তলায় একটি বাণিজ্যিক দোকান রয়েছে, যেখান থেকে মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ভাড়া আসে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, নীলক্ষেত, নিউমার্কেট ও খিলক্ষেত এলাকায় তার বা তার স্বজনদের নামে একাধিক দোকান রয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে ফ্ল্যাট, বাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগসহ শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, সাংঘাইল এলাকায় “সাংঘাইল যুব সমাজ” নামে একটি সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাজুল ইসলাম। এছাড়া স্থানীয় একটি জামে মসজিদের কমিটি নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
এলাকাবাসী, ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা জাল সনদ, চাকরি বাণিজ্য, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলামের ভাই পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে ফোনে হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি দাবি করেন, তাজুল ইসলামকে নিয়ে আর কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হবে। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com