সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৪৩ অপরাহ্ন
কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি:: বোমা তৈরির আস্তানা, ইয়াবা কারখানা, মাদক, হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি ও ছিনতাই অপরাধের এমন বিস্তৃতিতে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়ন এখন আর শুধু অপরাধ প্রবণ এলাকা নয়। অপরাধের ধরন ও প্রবণতায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মতোই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে এলাকাটি।
গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, শুভাঢ্যা ইউনিয়ন একাধিক এলাকায় নিয়মিত ঘটছে মাদক ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। মিলছে অস্ত্র ও ইয়াবা তৈরির কারখানার সন্ধান। ঘটছে হত্যা, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধও।
ইয়াবা কারখানা থেকে বোমা তৈরির আস্তানা
শুভাঢ্যার অপরাধচিত্রের সর্বশেষ সংযোজন ইয়াবা তৈরির কারখানা। গত ৩ আগস্ট সাবান ফ্যাক্টরি মদিনানগর এলাকায় রং তৈরির কারখানার আড়ালে চলা একটি ইয়াবা কারখানার সন্ধান পায় র্যাব-২। সেখান থেকে ১৯ হাজার ইয়াবা বড়ি, বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল ও তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় কারখানার মালিক নাসির হোসেনকে। র্যাবের দাবি, প্রায় ১০ বছর ধরে ওই কারখানায় ইয়াবা উৎপাদন চলছিল। ৩১ জুলাই রাতে শুভাঢ্যার কালীগঞ্জ বড় মসজিদ এলাকায় ৮০০ পিস ইয়াবাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা জেলা দক্ষিণ ডিবি পুলিশ।
এর আগে ১৩ জুলাই হাসনাবাদ এলাকা থেকে পাঁচ কেজি গাঁজাসহ বাবুল মিয়া (৪৫) নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৮ জুলাই মাঠের কোনা এলাকা থেকে ১ লাখ ১০ হাজার জাল টাকাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ১২ জুন নাজিরেরবাগের ঝিলমিল আবাসন প্রকল্প এলাকা থেকে চার কেজি গাঁজাসহ জুয়েল (৫৮) নামের এক ব্যক্তিকে এবং একই দিন শুভাঢ্যা পূর্বপাড়া হিজলতলা কামারবাড়ি এলাকা থেকে ৫১ পিস ইয়াবাসহ হোসেন (৪২) নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
গত ৯ মে হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় ব্যবসায়ী আকবর আলীর বাসার গেট ও কক্ষের দরজা ভেঙে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান মালামাল লুটের অভিযোগ ওঠে। এর আগে গত ৩ এপ্রিল একই এলাকার বাসায় চুরির শিকার হন দৈনিক কালের কণ্ঠের মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক রাকিব মোল্লা। তাঁর পরিবারের স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থসহ মূল্যবান মালামাল নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
মাদকের পাশাপাশি অস্ত্রের উপস্থিতিও মিলেছে এ এলাকায়। গত ২৯ এপ্রিল দক্ষিণ পারগেন্ডারিয়া এলাকা থেকে ৬৮ রাউন্ড গুলিসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১০। এর আগে ৯ মার্চ হাসনাবাদ এলাকায় তিনটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও ১২ রাউন্ড গুলিসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি হাসনাবাদ লাজফার্মার গলি এলাকা থেকে নিজাম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার তৎকালীন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ শাহীনের বিরুদ্ধে। পরে নিজাম উদ্দিন আটজনকে আসামি করে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন। ঘটনার পর ফয়েজ আহমেদ শাহীনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তিনি পদ ফিরে পান।
এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ বালুর মাঠ এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহমেদ দেওয়ান (৬০) নামের এক নিরাপত্তাপ্রহরী নিহত হন।
শুধু অস্ত্র ও মাদক নয়, বোমা তৈরির আলামতও পাওয়া গেছে শুভাঢ্যায়। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর হাসনাবাদ হাউজিং এলাকার উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক, চারটি ককটেল সদৃশ বস্তু, একটি ল্যাপটপ ও দুটি মনিটর উদ্ধার করে। পরে এ ঘটনায় প্রধান আসামি আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)।
হত্যা, ধর্ষণ ও অপহরণ
গত ১৯ জুন শুভাঢ্যার খেজুরবাগ সাতপাখি এলাকায় তুচ্ছ বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে ইমন হোসেন (২৫) নামের এক যুবক নিহত হন। এর আগে ১৫ জুন শুভাঢ্যা জেলেপাড়া এলাকায় মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক গৃহবধূকে হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গত ২৩ মে নাজিরেরবাগ ঝিলমিল আবাসন প্রকল্প এলাকা থেকে চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১০। ৩০ এপ্রিল কৈবর্তপাড়া এলাকায় ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগেও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অপহরণের অভিযোগও রয়েছে এলাকায়। গত ১৫ জুন থেকে দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর অপহরণকারীদের কাছ থেকে ফোন পেয়ে মুক্তিপণ দেওয়ার পরও শুভাঢ্যা বেবী ষ্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা ডেকোরেটর ব্যবসায়ী মো. শাহীন (৪৫) বাড়িতে ফেরেননি বলে অভিযোগ ওঠে।
সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ঝিলমিলে
শুভাঢ্যার অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ঝিলমিল আবাসন প্রকল্প। সন্ধ্যা নামলেই প্রকল্পের অনেকটা এলাকা অন্ধকার হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত সড়কবাতি নেই। নেই পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজনও প্রয়োজনের তুলনায় কম। এই সুযোগেই সেখানে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঝিলমিলের খালি প্লট ও নির্মাণাধীন স্থাপনাগুলো অপরাধীদের নিরাপদ আড়াল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে।
সর্বশেষ গত ৩১ জুলাই প্রকল্প এলাকা থেকে সত্তোর্ধ্ব হাসিনা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগে গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর শুভাঢ্যার নাজিরেরবাগ এলাকার সুধার বাড়ি সড়কে সগির হোসেন (২৫) নামের এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার কিছু সময় পর তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। ঘটনাটি তখন কেরানীগঞ্জজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। তবে ঘটনার ২৮২ দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সরেজমিনে ঝিলমিল এলাকায় গিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোর ও সন্ধ্যার দিকে কিশোর ও যুবকদের একটি অংশ ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পথচারীদের কাছ থেকে মুঠোফোন, টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। অটোরিকশার গতিরোধ করে যাত্রীদের কাছ থেকেও মালামাল নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নাজিরেরবাগ এলাকার বাসিন্দা ইয়াজউদ্দিন তালুকদার বলেন, মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ঝিলমিল এলাকায় ছিনতাই করে থাকে। ছিনতাইয়ের টাকা দিয়ে তারা মাদক সেবন করে। তাই এখান থেকে অপরাধ কমাতে হলে আগে মাদকের স্পটগুলো বন্ধ করতে হবে।
ঝিলমিলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য বলেন, এত বড় এলাকায় নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তাঁদের জনবল খুবই কম। দিনের বেলায় টহল দেওয়া সম্ভব হলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। রাতে টহলে বের হলে আমাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। তাই আমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত নজরদারি করি। তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত জনবল ও পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরা থাকলে নজরদারি অনেক সহজ হতো।
ছিনতাইয়ের কয়েকটি ‘স্পট’
শুভাঢ্যার ঝিলমিল, বেগুনবাড়ি, হিজলতলা বাসস্ট্যান্ড, বাঘৈর, চিতাখোলা, দিঘীরপাড়, পারগেন্ডারিয়া, চরকালীগঞ্জ, কালীগঞ্জ ১ নম্বর বাড়ি ও কালীগঞ্জ ডকইয়ার্ড এলাকাকে ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এলাকাবাসী।
বেগুনবাড়ির বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, দিনদুপুরেও সেখানে ছিনতাই হয়। রিকশায় করে ছিনতাইকারীরা এসে পথচারীদের গতিরোধ করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা ও মালামাল নিয়ে যায়।
হিজলতলার বাসিন্দা সামিউল আলম বলেন, বাসস্ট্যান্ড হওয়ায় এখানে দূর-দূরান্তের মানুষের যাতায়াত বেশি। বহিরাগতদের লক্ষ্য করে ছিনতাইকারীরা সুযোগ নেয়। স্থানীয় না হওয়ায় অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগও করেন না। তিনি আরও বলেন, শুভাঢ্যা এখন মোহাম্মদপুরের মতো ছিনতাইকারী আর মাদকের আখড়া হয়ে উঠছে। এখানে পুলিশি টহল আরও বাড়ানো দরকার।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর কেরানীগঞ্জ শাখার সমন্বয়ক কাওসার আহমেদ বলেন, শুভাঢ্যায় অপরাধের হার উদ্বেগজনক। ঘনবসতি ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য যাচাইয়ের ঘাটতি অপরাধীদের জন্য সুবিধা তৈরি করছে। শুধু অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণ, মাদক স্পট চিহ্নিত করা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও শুভাঢ্যার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গত ৯ জুলাই ইকুরিয়া এলাকায় ঢাকা জেলা পুলিশের আয়োজিত কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের পরিচিতি সভায় তিনি বলেন, বাঘৈর, চিতাখোলা ও আশপাশের কিছু এলাকায় এখনো অপরাধের বিস্তার রয়েছে। কদমতলী মোড়সহ আশপাশের এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা ও মাদক বেচাকেনা নিয়েও তিনি উদ্বেগ জানান।
ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরানীগঞ্জ সার্কেল) মো. জামিলুল হক বলেন, দরিদ্র মানুষের বসবাস ও ঘনবসতির কারণে এ ইউনিয়নে অপরাধের প্রবণতা বেশি। অপরাধ নির্মূলে আমাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। এ ইউনিয়নকে ঘিরে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। শিগগিরই বিশেষ দল গঠন করে অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি আরও বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়। এ জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সহযোগিতা ও সচেতনতা প্রয়োজন।