বৃহস্পতিবার, ১৮ Jun ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ন

কেঁচো চাষে বদলে গেল নুরেশার জীবন!

মোঃ বিপ্লব, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:: একসময় সংসারের নিত্য অভাব-অনটন ছিল নুরেশা আক্তারের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বামীর সীমিত আয়ে কোনো রকমে চলত সংসার। কিন্তু দারিদ্র্যের সেই চক্র ভেঙে নিজের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন ছিল তার মনে। সেই স্বপ্নই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ইউটিউবে দেখা একটি ভিডিও থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কেঁচো দিয়ে জৈব সার উৎপাদনের যে ছোট্ট উদ্যোগ তিনি শুরু করেছিলেন, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে একটি সফল কৃষি প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার রাতোর ইউনিয়নের আটকরা গ্রামের গৃহিণী নুরেশা আক্তার আজ স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক অনুকরণীয় নাম। তার প্রতিষ্ঠিত ‘মেসার্স নুরেশা অ্যাগ্রো ফার্ম’ এখন এলাকার কৃষকদের কাছে পরিচিত একটি ব্র্যান্ড। উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্টের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলার গন্ডি পেরিয়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলায়ও।

নুরেশা আক্তার জানান, নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই একদিন তিনি ইউটিউবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের একটি ভিডিও দেখেন। পরিবেশবান্ধব এই জৈব সার তৈরির প্রক্রিয়া তাকে আকৃষ্ট করে। এরপর অল্প কয়েকটি কেঁচো সংগ্রহ করে বাড়ির আঙিনায় পরীক্ষামূলকভাবে জৈব সার উৎপাদন শুরু করেন। শুরুতে প্রতিবেশীদের অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কেউ কেউ কেঁচো চাষকে অদ্ভুত উদ্যোগ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু নুরেশা হাল ছাড়েননি।

নিজের প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের পাশাপাশি তিনি কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিতে শুরু করেন। তার আগ্রহ ও সম্ভাবনা দেখে এগিয়ে আসে উপজেলা কৃষি বিভাগ। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ এবং সরকারি প্রকল্পের আওতায় তাকে দেওয়া হয় ভার্মি কম্পোস্ট সেপারেটিং মেশিন, সিলিং মেশিন, উৎপাদন ঘর ও পিট নির্মাণে সহায়তা। পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও ও তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। ধীরে ধীরে তার উৎপাদিত জৈব সারের চাহিদা বাড়তে থাকে। কৃষকরা রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে এই জৈব সারের কার্যকারিতা বুঝতে শুরু করেন। ফলে উৎপাদনও বাড়াতে হয়। ২০২৩ সালে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বামীও চাকরি ছেড়ে তার সঙ্গে এই উদ্যোগে যুক্ত হন। এরপর তারা ‘ফসল বন্ধু জৈব সার’ নামে প্যাকেটজাত করে বাজারে পণ্য সরবরাহ শুরু করেন।

বর্তমানে তাদের খামারে রয়েছে দুটি আধুনিক উৎপাদন শেড, ১৫টি পিট ও ৫০টি রিং। প্রতি মাসে প্রায় ১০ মেট্রিক টন ভার্মি কম্পোস্ট এবং প্রায় ১০ কেজি কেঁচো উৎপাদন হয়। উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট প্রতি কেজি ১৫ টাকা এবং কেঁচো প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় এক লাখ টাকা লাভ করছেন নুরেশা ও তার পরিবার। শুধু নিজের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নই নয়, তার এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় আরও তিনজন নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তারা নিয়মিত খামারে কাজ করে আয় করছেন এবং নিজেদের পরিবারেও আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে পারছেন।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভার্মি কম্পোস্ট মাটির জৈব গুণাগুণ বৃদ্ধি করে, ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমায়। ফলে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে জৈব সারের ব্যবহার ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

রাণীশংকৈল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর একটি জৈব সার। নুরেশা আক্তারের সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম এবং ইচ্ছাশক্তি থাকলে গ্রামীণ নারীরাও সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন। তার এই অর্জন অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস।

এক সময় যে নারী সংসারের অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করতেন, আজ তিনি সফলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নুরেশা আক্তারের গল্প শুধু একজন নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির গল্প নয়; এটি স্বপ্ন, সাহস, অধ্যবসায় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। তার সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে গ্রামীণ নারীরাও দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com