সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ০৪:৫৪ অপরাহ্ন

  একুশের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তোলপাড়, নড়েচড়ে বসেছে রাজউক, শোকজ অভিযুক্ত ইন্সপেক্টর; তদন্তে কঠোর বার্তা চেয়ারম্যানের

একুশের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তোলপাড় নড়েচড়ে বসেছে রাজউক, শোকজ অভিযুক্ত ইন্সপেক্টর; তদন্তে কঠোর বার্তা চেয়ারম্যানের

নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ

রাজধানীর কদমতলী থানার মুরাদপুর মাদ্রাসা রোড এলাকায় অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণ, দায়িত্বে অবহেলা এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে একুশের কণ্ঠ পত্রিকায় ধারাবাহিক অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংস্থাটির অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা, ইতোমধ্যে অভিযুক্ত ইন্সপেক্টরকে শোকজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গত ১১ মে প্রকাশিত একুশের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ ওঠে, রাজউকের জোন-৭ এর ১ আওতাধীন কদমতলীর মুরাদপুর মাদ্রাসা রোড এলাকায় একাধিক ভবন অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি উপেক্ষা করে নির্মাণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে অভিযুক্ত রাজউক ইন্সপেক্টর শিয়াবের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অনিয়মে প্রশ্রয় দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও উঠে আসে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি রাজউক প্রশাসনের নজরে আসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ইন্সপেক্টর শিয়াব বলেন, “উক্ত ভবনের নকশা অনুমোদনের কাগজপত্র চেয়ে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।” শোকজের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমার নামে অফিস থেকে একটি শোকজ হয়েছে। আমি এখনো জবাব দেইনি, খুব দ্রুতই জবাব দেব।”

এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ রিয়াজুল ইসলাম কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “রাজউক এখন আগের অবস্থানে নেই। এখানে কর্মরত কেউ যদি অন্যায় বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে সে কোনোভাবেই পার পাবে না। অভিযোগ উঠলে তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি আমলে নিয়েছি এবং দ্রুতই সংশ্লিষ্ট ইন্সপেক্টরদের সঙ্গে বৈঠকে বসবো।”
তিনি আরও বলেন,

“রাজধানী ঢাকাকে একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে রাজউক কাজ করে যাচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যক্তিস্বার্থে আইন লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাজউকে চাকরি করে অনিয়ম করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অনুমোদনবিহীন ভবন নির্মাণ চললেও কার্যকর কোনো তদারকি ছিল না। বরং কিছু অসাধু কর্মকর্তা এসব অনিয়মকে কেন্দ্র করে অবৈধ আর্থিক সুবিধা আদায়ে জড়িয়ে পড়েছেন। সংবাদ প্রকাশের পর এলাকাবাসী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে এবার হয়তো দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত ভবনগুলোর বিরুদ্ধে একজন মানবাধিকারকর্মী রাজউক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও সংশ্লিষ্ট অথরাইজড কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসেন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযোগ দাখিলের সময় ভবনটির একতলার নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও বর্তমানে সেটি দোতলা পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগ করে আরো বলেন এই এলাকাতে শুধু একটি বিল্ডিং এর সীমাবদ্ধ নয় এমন একাধিক বিল্ডিং আছে যেগুলো নিয়ম-নীতি থাকা না করলেও মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে অথরাইজ অফিসার ইলিয়াস হোসেন এড়িয়ে গেছেন যার ফলে অবৈধ বিল্ডিং নির্মিত হয়েছে। যেগুলো ভূমিকম্প সহ বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণহানি ঘটবে শত শত মানুষের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, “শুধু ইন্সপেক্টরদের দোষ দিয়ে সব দায় এড়ানো যায় না। অনেক ক্ষেত্রে অথরাইজড কর্মকর্তারাও নিজেদের স্বার্থে ইন্সপেক্টরদের ব্যবহার করেন। মোটা অঙ্কের সুবিধার বিনিময়ে অনেক অনিয়মই ধামাচাপা পড়ে যায়।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, তদন্ত যেন শুধুমাত্র শোকজ নোটিশেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় রাজধানীতে অনুমোদনহীন নির্মাণ ও দুর্নীতির এই চক্র কখনোই বন্ধ হবে না। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পরিকল্পনাহীন ভবন নির্মাণ শুধু নগর ব্যবস্থাপনাকেই বিপর্যস্ত করে না, বরং জননিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে। তাই দুর্নীতিমুক্ত তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

একুশের কণ্ঠ’র ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ঘিরে এখন সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন তদন্ত শেষে আদৌ কি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি সবকিছু শেষ পর্যন্ত শুধুই শোকজ নোটিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com