সোমবার, ১৫ Jun ২০২৬, ০৬:১২ অপরাহ্ন

শরীয়তপুরে জন্মান্ধ রাজিয়ার বেঁচে থাকার সংগ্রাম

মোঃ নাসির খান, শরীয়তপুর প্রতিনিধি:: জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। কিন্তু অন্ধকারকে কখনো নিজের ভবিষ্যতের বাধা হতে দেননি রাজিয়া সুলতানা। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারে না। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর মেধার জোরে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স সম্পন্ন করেছেন তিনি। তবু উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে নিয়েও আজ কর্মহীন এই মেধাবী তরুণী। বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবার পরিবারে বোঝা না হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও সেই স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার আলাওলপুর ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি মুন্সিবাড়ির মেয়ে রাজিয়া সুলতানা যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান কবির ও সুফিয়া কবিরের ছয় সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। জন্মান্ধ হলেও ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। মেয়ের মেধা ও ইচ্ছাশক্তিকে মূল্য দিয়ে মা-বাবাও সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন। রাজিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকার মিরপুর এলাকার ব্যাপটিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলে। পরে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি এবং বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (আইইআর) বিশেষ শিক্ষা বিভাগ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেন।

উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর স্বপ্ন ছিল একটি সম্মানজনক চাকরির মাধ্যমে পরিবারকে সহযোগিতা করার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একাধিক চাকরির লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত ভাইভা বোর্ডের গণ্ডি পেরোতে পারেননি তিনি। এদিকে পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একমাত্র ভাই সুমন আহমেদ একটি দোকানে চাকরি করে কোনোমতে সংসারের খরচ চালান। অন্যদিকে এক বছর ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান কবির। অতি দ্রুত রাজিয়ার একটি চাকরি চান স্থানীয় মানুষজন ও তার স্বজনরা।

রাজিয়ার প্রতিদিনের সংগ্রামী জীবন খুব কাছ থেকে দেখেন প্রতিবেশী ফাতেমা বেগম। ছোটবেলা থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজিয়ার অদম্য প্রচেষ্টা, শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একজন মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণী হয়েও চাকরির সুযোগ না পাওয়ায় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। ফাতেমা বেগম বলেন, একজন স্বাভাবিক মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করলেই চাকরির সুযোগ পায়। কিন্তু রাজিয়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় সেই সুযোগ পাচ্ছে না বলে আমাদের মনে হয়। সে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ভাইভায় বাদ পড়েছে। আমরা চাই সরকার তার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করুক।

রাজিয়াকে ঘিরে উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তার শেষ নেই স্বজনদের। বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা-মা আজও তাকে আগলে রেখেছেন ভালোবাসা আর স্নেহের বন্ধনে। কিন্তু সময় তো কারও জন্য থেমে থাকে না। তাই স্বজনদের মনে একটাই প্রশ্ন, বাবা-মা একদিন না থাকলে রাজিয়ার ভবিষ্যৎ কী হবে? কে হবে তার আশ্রয়, কে দেবে ভরসা? উচ্চশিক্ষিত হয়েও কর্মসংস্থানের সুযোগ না পাওয়ায় এই দুশ্চিন্তা আরও গভীর হচ্ছে। রাজিয়ার চাচাতো ভাই সাইদুর রহমান বলেন, আমার বোনটি ছোটবেলা থেকে অনেক সংগ্রাম করে বড় হয়েছে। দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ থেকে পড়াশোনা শেষ করেও সে বেকার। এটি সত্যিই কষ্টের বিষয়। এখন চাচা-চাচি বেঁচে আছেন, তাদের আশ্রয়ে রাজিয়া আছেন। তারা যেদিন না থাকবেন, এই অন্ধ মেয়ের কী হবে? সরকার তার যোগ্যতার মূল্যায়ন করে চাকরির ব্যবস্থা করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রাজিয়া সুলতানা বলেন, ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে নিজের যোগ্যতায় চাকরি করব। আমি কখনো নিজেকে অসহায় বা অক্ষম মনে করিনি। আমিও অন্য সবার মতো একজন মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেও এখনো চাকরি না পাওয়াটা কষ্টের। তবে আমি বিশ্বাস করি, একদিন আমার যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে। আমি একটি চাকরি পেয়ে কারও বোঝা হয়ে থাকব না।

রাজিয়ার এই সংগ্রামী জীবনের কথা জেনে পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুশরাত আরা খানম বলেন, রাজিয়া সুলতানার বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। সে উচ্চশিক্ষিত এবং মেধাবী। ভবিষ্যতে চাকরির জন্য আবেদন করলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যোগ্যতার ভিত্তিতে তার কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে বলে আমরা আশা করি।

মোবাইল নং- 01811225338

রাজিয়া মোবাইল নং- 01766041093

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com