মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ডেস্ক ॥
রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ব্যস্ততম পরিবহন হাব গুলিস্তান এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক মূর্তমান আতঙ্ক। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও বদলায়নি এখানকার ফুটপাত ও সড়কের চিত্র। বরং পুরোনো চিহ্নিত লাইনম্যানরা এখন ‘জাতীয়তাবাদী হকার্স দল’ বা বিভিন্ন সংগঠনের নতুন মোড়কে পুরো এলাকা নিজেদের কবজায় নিয়েছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে মূল রাস্তার সিংহভাগ দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে এক শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট।
পজিশন নিতে লাগে ৫ লাখ, দৈনিক চাঁদা হাজার টাকা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট, জিপিও, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এবং গোলাপশাহ মাজার এলাকায় নতুন কোনো হকার বসতে চাইলে তাকে শুরুতেই গুনতে হয় মোটা অঙ্কের ‘পজিশন ফি’। এলাকাভেদে এই ফি ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হকার জানান, শুধু বসার অনুমতি পেতেই এই টাকা লাইনম্যানদের হাতে তুলে দিতে হয়, নতুবা ফুটপাতে দাঁড়ানোও অসম্ভব।
চাঁদাবাজির এই প্রক্রিয়া চলে মূলত তিনটি স্তরে:
পজিশন ফি: নতুন বসার জন্য এককালীন ২ থেকে ৫ লাখ টাকা।
দৈনিক চাঁদা: দোকান বা ভ্যানের আকার অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০ থেকে ১,০০০ টাকা।
মাসিক বিট ভাড়া: নির্দিষ্ট সীমানার জন্য প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
হিসাব অনুযায়ী, গুলিস্তানের হাজার হাজার দোকান থেকে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
চিহ্নিত লাইনম্যানদের নিয়ন্ত্রণে সড়ক ও ফুটপাত
গুলিস্তানের বিভিন্ন পয়েন্ট ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ২০ জন প্রভাবশালী লাইনম্যান। তাদের মধ্যে:
নবী: রাজধানী হোটেল ও বেল্টের গলি এলাকা।
হারুন: গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনের এলাকা।
রজ্জব, লম্বা বাবুল ও সেলিম: গুলিস্তান বিল্ডিং থেকে ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত।
শাহজাহান: ওসমানী উদ্যান পূর্ব এলাকা।
কাদির: খদ্দর মার্কেটের সামনের এলাকা।
খলিল ও পুটন: স্টেডিয়ামের দক্ষিণ গেট।
মোহাম্মদ আলী: ফুলবাড়িয়া ও বাস টার্মিনাল এলাকা।
এই লাইনম্যানরা প্রতিদিন বিকেলে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করেন এবং তাদের সংগৃহীত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করেন। চাঁদা দিতে দেরি হলে হকারদের উচ্ছেদসহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
নেপথ্যে হকার্স সংগঠন
অভিযোগ রয়েছে, এই লাইনম্যান সিন্ডিকেটের পেছনে ছায়া হয়ে কাজ করছে নিবন্ধনবিহীন বিভিন্ন হকার্স সংগঠন। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম বলেন, “হকারদের শৃঙ্খলায় ফেরাতে হলে আগে এই লাইনম্যান নামক চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এরপর সিটি করপোরেশনের তালিকা অনুযায়ী আইডি কার্ড দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বসার ব্যবস্থা করতে হবে।”
সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ ও বাস্তবতা
গত মাসের শুরুতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালালেও কয়েক দিন পরেই আবার ফুটপাত দখল হয়ে যায়। তবে বর্তমান প্রশাসন বলছে, তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম জানান, “চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রকৃত হকারদের জন্য আইডি কার্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে যেন তারা বৈধভাবে ব্যবসা করতে পারেন। কার্ডধারী হকারদের থেকে কেউ চাঁদা নিতে পারবে না।”
গুলিস্তানকে যানজটমুক্ত ও পথচারীবান্ধব করতে হলে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ ও নগর পরিকল্পনাবিদগণ।