শুক্রবার, ১২ Jun ২০২৬, ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন
হোসাইন মোহাম্মদ সাগর ।
প্রতিটি মানুষের জীবনের অধিকার জন্মগত। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা রক্ষা করা—শেষ করে দেওয়া নয়। অথচ এখনও বিশ্বের বহু দেশে মৃত্যুদণ্ড নামক এক ভয়াবহ, চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনযোগ্য শাস্তি কার্যকর রয়েছে—যা মূলত প্রতিশোধের ছদ্মবেশে পরিচালিত হয়।
বিশ্বের অনেক দেশ যখন মানবিক ও ন্যায়নিষ্ঠ বিচারব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখনো বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা মানবাধিকারের পক্ষে এক বড় ধাক্কা। ১০ অক্টোবর পালিত বিশ্ব মৃত্যুদণ্ড বিলোপ দিবস প্রতিবছর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, এই অনুশীলন আমাদের সভ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে এক প্রস্তাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আহ্বান জানায়। যদিও এটি আইনি বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে না, তবে নৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রস্তাব মূলত মানবাধিকার সংরক্ষণের একটি স্পষ্ট বার্তা—জীবন কখনোই রাষ্ট্রের প্রতিশোধের হাতিয়ার হতে পারে না।
বাংলাদেশের আইনে এখনও খুন, ধর্ষণ, যুদ্ধাপরাধ, রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসবাদের মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শাস্তি কতটা কার্যকর? বাস্তবতা হলো, মৃত্যুদণ্ড অপরাধের হার কমায় না। বরং এটি ধনী-গরিব, ক্ষমতাধর ও নিপীড়িতের মাঝে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তোলে।
কানাডা বহু বছর আগেই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ ও পুনর্বাসনকেন্দ্রিক নীতির মাধ্যমে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এখনও মৃত্যুদণ্ড চালু, অথচ অপরাধের হার সেখানে অনেক বেশি। এসব পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেয় যে মৃত্যুদণ্ড অপরাধ দমনে কার্যকর নয়।
মৃত্যুদণ্ড একটি পরিকল্পিত হত্যা। এটি রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে ঠাণ্ডা মাথায় প্রাণ নেওয়ার কাজ। এটি শুধু অভিযুক্তকে নয়, তার পরিবার ও প্রিয়জনদেরও চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। বিশেষ করে যাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দণ্ডিত হন, তাদের জীবনে অভাব, কলঙ্ক আর মানসিক ধাক্কা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৩ সালের পর থেকে ১১৬ জন নিরপরাধ ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পাওয়ার পর নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। বাংলাদেশে যেখানে বিচারপ্রক্রিয়া আরও দুর্বল, সেখানে নিরপরাধ কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানো খুব অসম্ভব নয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ বলছে, কাউকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অপমানজনক শাস্তি দেওয়া যাবে না। মৃত্যুদণ্ড এসবের সবকটিই। এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন—একটি বিকারগ্রস্ত প্রতিক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি।
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে বা কার্যত তা ব্যবহার করছে না। ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ তার উদাহরণ। বাংলাদেশ কেন পারবে না?
সময়ের দাবি হলো—আমরা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দিই। রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোকে সংস্কার করি এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো অমানবিক বিধান থেকে সরে এসে মানবিকতা, সহানুভূতি ও যুক্তির ভিত্তিতে একটি সভ্য বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলি।
এটি শুধু আইনি সংস্কার নয়, আমাদের মানবতা, বিবেক এবং সভ্যতার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
হোসাইন মোহাম্মদ সাগর
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক