বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ন

স্বপ্ন নিয়ে গেল প্রবাসে, ফিরল লাশ হয়ে

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:: অভাব ঘুচিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল তার। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই সুদূর প্রবাসে পাড়ি দিয়েছিলেন তরুণ সোহান। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাকে ফিরিয়ে আনল নিথর দেহ হয়ে এক রক্তাক্ত পরিণতির নির্মম সাক্ষ্য রেখে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ছয় দিন পর মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বিকাল ৫টার দিকে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের চিকনমাটি গ্রামের নিজ বাড়িতে পৌঁছায় ২১ বছর বয়সী সোহানের মরদেহ। লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। শেষবারের মতো একনজর দেখতে হাজারো মানুষের ঢল নামে তার বাড়িতে। কান্না, আহাজারি আর নিঃশব্দ বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ।

নিহত সোহান ওই গ্রামের দুলাল মিয়ার একমাত্র ছেলে। সংসারের হাল ধরতে ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ এক বুক হাহাকারে পরিণত হয়েছে।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের অদূরে কতলেহং এলাকায় ঘটে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। সেখানে একটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন মুদি দোকানে কর্মরত ছিলেন সোহান। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় নামাজের পর হঠাৎ লোডশেডিং হলে চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়। সেই সুযোগে আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দোকানে ঢুকে পড়ে। দোকানের মালিক পেছনের দিকে গেলে একা থাকা সোহানকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যু হয় এই তরুণের। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দোকান সংক্রান্ত ব্যবসায়িক বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। স্থানীয়দের মতে, দোকানের বাংলাদেশি মালিকের সঙ্গে পাশের এক সোমালি নাগরিকের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে এই হামলা চালানো হতে পারে। শুক্রবার সকালে সোহানের মৃত্যু সংবাদ গ্রামে পৌঁছালে সৃষ্টি হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মা। স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো চিকনমাটি গ্রাম। দীর্ঘ ছয় দিন পর প্রিয় সন্তানের মরদেহ হাতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

নিহতের বাবা দুলাল মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলের লাশ দেখতে হবে কখনো ভাবিনি। ধারদেনা করে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম ভাগ্য বদলাতে, এখন সব শেষ হয়ে গেল।

রাণীশংকৈল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমানুল্লাহ আল বারী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং একই দিন জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। প্রবাসে জীবনযুদ্ধে নামা অসংখ্য তরুণের মতো সোহানও স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন দূরদেশে। কিন্তু তার এই মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল প্রবাসের পথ শুধু সম্ভাবনার নয়, অনেক সময় তা অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকিতে ভরা এক কঠিন বাস্তবতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com