বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:২৮ পূর্বাহ্ন

সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সরকারের ব্যয় ছাড়াল ৩ হাজার কোটি টাকা

ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক, একুশের কণ্ঠ:: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে সরকারের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বাজেটে বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় এই ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেওয়া হচ্ছে ‘অপ্রত্যাশিত’ খাত থেকে।

চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অনুকূলে ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তবে একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। এ কারণে কমিশন আরও ১ হাজার ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দের আবেদন করে, যা যৌক্তিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মূল বরাদ্দের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা ইতোমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াও চলমান। পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত খাত থেকে বরাদ্দ দেওয়া অতিরিক্ত অর্থের প্রথম কিস্তি হিসেবে গত সপ্তাহে ২৬৭ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। বাকি ৮০২ কোটি টাকা পর্যায়ক্রমে তিন কিস্তিতে ছাড় করা হবে।

সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য মোট ২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজন, প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ এবং বিশেষ সচেতনতামূলক প্রচারণার কারণে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব নয়।

ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দৈনিক খোরাকি ভাতায় ৭৩০ কোটি টাকা। সরকারি যানবাহনের জ্বালানি তেলে ব্যয় হবে ২৯৮ কোটি টাকা এবং চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি টাকা। এছাড়া মনিহারি পণ্য কেনাকাটায় ৫৮১ কোটি, নির্বাচন পরিচালনায় অংশগ্রহণকারীদের সম্মানি বাবদ ৫১৫ কোটি, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয়ে ১৬২ কোটি এবং মুদ্রণ ও বাঁধাই খাতে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া যাতায়াত ভাতায় ১০৯ কোটি, বিজ্ঞাপন ও প্রচারে ১০৩ কোটি, আপ্যায়ন খাতে ১৮৪ কোটি, পরিবহন ব্যয়ে ৮০ কোটি, অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি বাবদ ৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকা। অন্যান্য খাত মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

ইসি সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে বিশ্বের ১২৩টি দেশ থেকে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন। প্রতিটি ভোটগ্রহণে সরকারের গড় ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকা।

এছাড়া সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালান। কিন্তু গণভোটে কোনো প্রার্থী বা প্রতীক না থাকায় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ভোটারের মধ্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝাতে পৃথকভাবে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হচ্ছে, যা নির্বাচন কমিশনকেই করতে হচ্ছে। এ কারণেই নির্বাচনি কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারিত হচ্ছে, খরচও বাড়ছে। এছাড়া নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে ইসি। ১০ লাখের বেশি প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন গ্রুপে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ভোটগ্রহণের ৪-৫ দিন আগে শেষ হবে। এ প্রশিক্ষণ খাতে প্রায় ৭ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। তবে নির্বাচন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার পর সম্মানি দেওয়া হবে।

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতি চাপে থাকলেও নির্বাচন আয়োজনের জন্য অর্থের কোনো ঘাটতি হবে না। নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় নির্বাচন ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০২৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০২৫সহ সব আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে অর্থ ব্যয় করা যাবে না বলেও শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী অর্থবছরগুলোর বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। তবে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ বাড়িয়ে চার হাজার ১৯০ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে সংসদ নির্বাচনী ব্যয় ছিল দুই হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। আর জাতীয় নির্বাচন না থাকায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইসির মোট ব্যয় ছিল মাত্র ৮৭৮ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, উপকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com